জেএসএস’র দোসর এডভোকেট প্রতিম রায়কে রাঙামাটির পাবলিক প্রসিকিউটর করার ষড়যন্ত্র!
![]()
নিউজ ডেস্ক
গত ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগের পর দেশ ত্যাগ করা শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় সুপ্রিম কোর্টের এটর্নি জেনারেল থেকে শুরু করে দেশের সব জেলা-মহানগরের আদালতসমূহে নিয়োগকৃত সব পাবলিক প্রসিকিউটরদের (পিপি) নিয়োগ বাতিলপূর্বক নতুন করে দক্ষ ও নিরপেক্ষ আইজীবিদের নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতেও জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। দেশের অন্যান্য জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার মাপকাঠিকে প্রধান্য দেয়া হলেও পাহাড়ি এ জেলায় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি-জেএসএস এর দোসর ও একজন সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত সমালোচিত আইনজীবি এডভোকেট প্রতিম রায় পাম্পুকে পিপি হিসেবে নিয়োগ দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। তবে এ নিয়োগকে ষড়যন্ত্র উল্লেখ করে স্থানীয়রা বলছেন, স্বৈরাচারি সরকারের দোসরদের সরিয়ে দিয়ে এক বাঙ্গালি বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিকে পিপি নিয়োগ দেয়া হলে এ জেলার আইন অঙ্গনে নেমে আসবে কালো ছায়া।
রাঙামাটির একটি সূত্র বলছে, যুগ যুগ ধরে বে-আইনী ভাবে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ার দখল করে এটিকে জেএসএস এর প্রাতিষ্ঠানিক শাখায় রূপান্তর করা সাবেক গেরিলা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পরিষদের আইন উপদেষ্টা প্রতিম রায় পাম্পু ২০০৯ সালে রাঙামাটি সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সন্তু লারমার জেএসএস এর সমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছিলেন। এর আগে তিনি জেএসএস এর অঙ্গ সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতিও ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, পিসিপির সভাপতি থাকাকালীন সময়ে অপরাজনীতি, সংঘাত-সহিংসতাসহ নানা অপরাধের দায়ে তিনি আটক হয়ে জেলও খেটেছেন।
বর্তমান জেএসএস এর কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক কমিটিতে থাকা পাম্পুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তিনি রাঙামাটির সমতা ঘাটের রাং রাং রেষ্টুরেন্টে নিয়মিত নারী নিয়ে মদের আসর বসান এবং সেখান থেকে জেএসএস এর কেন্দ্রীয় নেতাদের বাসভবনে মনোরঞ্জনের জন্য সুন্দরী নারী সাপ্লাই দিয়ে থাকেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও শুধুমাত্র সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস এর আশির্বাদ থাকায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সাহস দেখায় নি রাঙামাটির প্রশাসন।

রাঙামাটির আইন অঙ্গনে দূর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিত পাম্পু অনেকটা আতঙ্ক আইনজীবি পাড়ায়ও। কথিত রয়েছে, যখনই রাঙামাটিতে কোন দুর্নীতিবাজ বিচারক পোষ্টিং এসেছেন, তার সাথে পাম্পুর সখ্যতা হয়ে গিয়েছে। বিচারকদের সাথে জেএসএস এর নেতাকর্মীসহ যত মামলায় অবৈধ আর্থিক লেনদেন হয়েছে, তা পাম্পুর মাধ্যমেই হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচিত এডভোকেটর প্রতিম রায় পাম্পু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র থাকায় সেখানকার অধ্যাপক ও বর্তমান অন্তর্বতী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সাথে তার পুরনো সখ্যতা রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফের সাথে পূর্ব ঘনিষ্টতা রয়েছে তার। এরই সুবাধে, ড. আসিফ নজরুলের কাছে সুপারিশের ভিত্তিতে সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের সহকারী এটর্নি জেনারেল নিয়োগে জেএসএস সমর্থিত সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি খাগড়াছড়ির পানছড়ির এডভোকেট প্রোজ্জল চাকমাকে সহকারী এটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এছাড়া, পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনীতির আরেক নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত আত্নস্বীকৃত রাজাকার ত্রিদিব রায়ের পুত্র ও বর্তমান চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়ের সাথে মিলে, নিরাপত্তাবাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময়ে অস্ত্রসহ আটক জেএসএস সন্ত্রাসীদের মুক্তি, পাহাড়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন ইস্যুতে চলা মামলা ও পাহাড়ে বাঙ্গালী এবং নিরাপত্তাবাহিনী সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে জেএসএস এর হয়ে আইনগত দিকগুলো পরিচালনা করেন এডভোকেট প্রতিম রায় পাম্পু। এছাড়া জেলার বিভিন্ন দপ্তরসহ রাজনৈতিক নেতাদের দূর্নীতি ও অনিয়মের মামলাগুলো পরিচালনায় তার নাম থাকে সবার উপরে।
সম্প্রতি দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় কর্তৃক বিতর্কিত সিএইচটি রেগুলেশন বাতিল করার পর চাকমা সার্কেল চীফ দেবাশীষ রায়ের আপন চাচা প্রতিম রায় পাম্পু এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা গেছে। ভাতিজা দেবাশীষ রায়ের সাথে মিলে পাহাড়ে নিরীহ উপজাতিদের উস্কে দিয়ে সিএইচটি রেগুলেশন বহালের দাবিতে মাঠে নামানোর কারিগরও এই পাম্পু।
পাহাড়ে জেলা পরিষদের পূর্বানুমতি ব্যতিত কেউ ভুমি ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে না মর্মে আইনটি রাঙামাটি জেলা পরিষদ আইনের ৬৪ ধারায় অন্তর্ভূক্তির মাষ্টার মাইন্ড এই প্রতিম রায় পাম্পু, ২০১৭-১৮ সালে সন্তু লারমার ছত্রছায়ায় রাঙামাটি আইনজীবী সমিতির সভাপতি হন। এরপর তিন পার্বত্য জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দদের নিয়ে একটি সেমিনার আয়োজন করে সেখানে পাহাড়ের বিতর্কিত লোকজনকে আমন্ত্রন জানিয়ে আঞ্চলিক পরিষদের গৌতম কুমার চাকমাকে দিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে পাহাড়ের তিন জেলার আইনজীবিদের অপমান করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পাহাড়ের নিরীহ উপজাতিদের অধিকার আদায়ের কথা বলে বিভিন্ন সময়ে আঞ্চলিক রাজনীতি উস্কে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাঙামাটি জেলা আইনজীবি সমিতির একাধিক সদস্য দাবি করেছেন, রাঙামাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলে পাহাড়ের আইন অঙ্গনের চিত্র পুরোপুরি পাল্টে যাবে এবং আইনের প্রতি বিচারপ্রার্থীদের বিশ্বাস উঠে যাবে। সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আইনী সহায়তা দেয়া পাম্পুকে পিপি নিয়োগ দেয়া হলে বিচারপ্রার্থীদের সেবা বন্ধ করার কথাও বলছেন অনেক আইনজীবি।
স্থানীয়রা বলছেন, মূলত অন্তর্বতীকালীন সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সুপ্রদীপ চাকমা সম্প্রতি তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ডসহ পাহাড়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন পদে সাম্প্রদায়িক চাকমা ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে পাহাড়ে একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরী করছেন। উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহনের পর তার বেশকয়েকটি বক্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যে পাহাড়ে ব্যাপক আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে। এছাড়া ২ সেপ্টেম্বর সোমবার বিতর্কিত যুগ্ন সচিব রিপন চাকমাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সুপ্রদীপ চাকমা উন্নয়ন বোর্ডকেও সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে রুপ দেয়ার চেষ্টা করছেন।
এরই ধারাবাহিকতায়, প্রতিম রায় পাম্পুকে রাঙামাটি জেলা ও দায়রা জর্জ কোর্টের পিপি নিয়োগ দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে দাবি করে একটি সূত্র বলছে, পাম্পুকে পিপি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলে পাহাড়ের তথা রাঙামাটির আঞ্চলিক রাজনীতি ও পাহাড়ি-বাঙ্গালী ইস্যুতে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়বে। যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে এ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।