পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি: সেনা সদস্যদের আত্মত্যাগের প্রশ্ন তুলে জামায়াতের ইশতেহার ঘোষণা
![]()
নিউজ ডেস্ক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ‘জনতার ইশতেহার’ নামে ঘোষিত এই নির্বাচনি পরিকল্পনায় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার, যুবকদের অগ্রাধিকার এবং নারীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করেছে দলটি।
আজ বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইশতেহার ঘোষণা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। অনুষ্ঠানে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াত সূত্রে জানানো হয়, মোট ২৬টি অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি নিয়ে এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে। এর প্রথম অংশে একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে শাসনব্যবস্থার সংস্কার, কার্যকর জাতীয় সংসদ, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং শক্তিশালী আইন ও বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে চার দফা অঙ্গীকার
ঘোষিত ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করে চারটি সুস্পষ্ট এজেন্ডা ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। এগুলো হলো—
১. পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার যথাযথ প্রতিফলনের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ।
২. পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ সকল জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও সুপেয় পানিসহ মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ।
৩. পাহাড়ে বসবাসরত সকল জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ ও বৈষম্য দূর করে সামগ্রিক নিরাপত্তা ও পারস্পরিক আস্থা প্রতিষ্ঠা।
৪. পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ।

সেনা সদস্যদের আত্মত্যাগের প্রশ্ন তুলে বক্তব্য
ইশতেহার ঘোষণার প্রারম্ভিক বক্তব্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও সহিংসতার প্রসঙ্গ টেনে সেনাবাহিনীর বিপুল আত্মত্যাগের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি বলেন,
“আমাদের দেশ খুবই ছোট, অথচ এখানে পাহাড় ও সমতলের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে রাখা হয়েছে। আমরা এই ব্যবধান ঘুচিয়ে দিতে চাই। পাহাড় ও সমতলের রেষারেষি, হিংসা-হানাহানি আমরা আর দেখতে চাই না।”
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জনগণ যদি তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে, তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের সেই পাওনা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। “তারা যেন গর্ব করে বলতে পারে—এই দেশ আমার, এই দেশ গড়ার দায়িত্বও আমার,” বলেন জামায়াত আমির।
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ন্যায্যতার অভাব ও দীর্ঘদিনের বঞ্চনাকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে উসকে দিয়ে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, যার ফলে পাহাড়ে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি বিরাজ করছে। “আমরা এই অশান্তির অবসান চাই,” বলেন তিনি।
সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন,
“এই পাহাড় রক্ষা করতে গিয়ে আমার জানামতে দশ হাজারেরও বেশি সেনাবাহিনীর সদস্য জীবন দিয়েছেন। কেন আমার দেশের বুকে এত সেনা সদস্যকে প্রাণ দিতে হবে? এর পেছনে কারা দায়ী—সেগুলো খুঁজে বের করে যৌক্তিক ও ন্যায্য সমাধান করা হবে, ইনশাআল্লাহ। এমন একটি সমাধান, যাতে সবাই আনন্দিত হতে পারে।”
স্থায়ী শান্তি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতিশ্রুতি
জামায়াত নেতারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে তারা কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং জাতীয় ঐক্য, ন্যায্যতা ও সার্বভৌমত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা, সকল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সেনা সদস্যদের অমূল্য আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন করাই ‘জনতার ইশতেহার’-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
ঘোষিত ইশতেহারের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে একটি রাজনৈতিক ও নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করেছে জামায়াতে ইসলামী, যা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।