গুইমারায় বাকপ্রতিবন্ধী মারমা তরুণীকে অপহরণের পর ধর্ষণের অভিযোগ, মূল অভিযুক্ত পালালো ভারতে
![]()
নিউজ ডেস্ক
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার গুইমারা উপজেলায় এক বাকপ্রতিবন্ধী মারমা তরুণীকে অপহরণ করে সাত দিন আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে স্বজাতির দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় স্থানীয় জনগণের হাতে এক অভিযুক্ত আটক হলেও অপরজন ভারতে পালিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী তরুণীর নাম উনিংকার মারমা (২১)। তিনি গুইমারা উপজেলার সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নের উত্তর হাফছড়ি এলাকার বাসিন্দা এবং উথোয়াইমং মারমার মেয়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩ মার্চ সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে উনিংকার মারমা নিজ বাড়ি থেকে জালিয়াপাড়া এলাকায় যান। এরপর থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তার বাবা উথোয়াইমং মারমা গত ৫ মার্চ গুইমারা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
নিখোঁজের খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালালেও প্রথমদিকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে গতপরশু সোমবার (৯ মার্চ) সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে অপহরণকারীরা ওই তরুণীকে জালিয়াপাড়া এলাকায় ফেলে রেখে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যান। তবে সন্ধ্যার দিকে তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়লে তাকে মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা তাকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য রেফার করেন।
মঙ্গলবার সরেজমিনে ভুক্তভোগীর বাসায় গিয়ে দেখা যায়, হাতে স্যালাইন লাগানো অবস্থায় মন্দিরের বারান্দায় পড়ে আছেন ভুক্তভোগী।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, তরুণীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। পরে সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নের গড়াইছড়ি এলাকা থেকে স্থানীয় জনগণ একজন সন্দেহভাজনকে আটক করে।
আটক ব্যক্তির নাম অংক্যজায় মারমা (৩৭)। তিনি খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার তিন্দুকছড়ি পাড়ার বাসিন্দা এবং মংপ্রু মারমার ছেলে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, এ ঘটনার আরেক মূল অভিযুক্ত ক্যজ মারমা (৫০) ইতোমধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন। তিনি খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার হেডম্যান পাড়ার বাসিন্দা কংঅং মারমার ছেলে।
বর্তমানে আটক অংক্যজায় মারমা সিন্দুকছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেদাক মারমার হেফাজতে রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনাটি প্রকাশ হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কয়েকজন প্রভাবশালী ও কিছু আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় না নিয়ে সামাজিক সমঝোতার মাধ্যমে মীমাংসা করার জন্য ভুক্তভোগীর পরিবারকে চাপ দিচ্ছে এবং ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ভুক্তভোগীর পরিবারকে আইনি পথে না যেতে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীর বাবা উথোয়াইমং মারমা তার মেয়ের নির্যাতনের বিচার দাবি করে বলেন, ‘আমার মেয়ে একজন বাক্প্রতিবন্ধী। সে নিজের কষ্টটুকুও ঠিকভাবে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। অংকজায় আমার মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে নির্য়াতন করেছে। আমি এর সঠিক বিচার চাই।’
জানতে চাইলে উত্তর হাফছড়ি পাড়া ধর্মরক্ষিত বৌদ্ধ বিহারের নেনাচরা ভান্তে বলেন, ‘মেয়েটিকে অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়েছে। এ ঘটনা অপ্রত্যাশিত, আমরা এর বিচার চাই।’
জানতে চাইলে গুইমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সেহরাওয়ার্দি বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, শুরুতে মেয়েটি হারানো গেছে মর্মে একটি জিডি করা হয়েছিল, তবে এ ঘটনায় স্থানীয়রা কাউকে আটক করেছেন কি না তা তার জানা নেই। তবে ভুক্তভোগীর পরিবারকে বিচার নিশ্চিতে থানায় মামলা করার জন্য একাধিকবার অনুরোধ স্বত্বেও তারা মামলা করেন নি। তবে অভিযোগ বা মামলা করলে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রন করা হবে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগীর পরিবারের উপর আঞ্চলিক কোন সশস্ত্র গোষ্ঠীর চাপ রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে ওসি জানান, আসলে পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি-পাহাড়ি এমন কোন ঘটনা ঘটলে তা থানা-পুলিশ কিংবা আইন-আদালতে না গিয়ে সামাজিক ভাবে মিমাংসার জন্য কিছুটা চাপ থাকে।
এদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গড়াইছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ দল ভুক্তভোগীর এলাকায় নিয়মিত টহল জোরদার করেছে।
এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তারা বলছেন, একজন বাকপ্রতিবন্ধী তরুণীর সঙ্গে এমন নৃশংস ঘটনার বিচার নিশ্চিত না হলে এলাকায় আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হবে।
উল্লেখ্য, পাহাড়ের বুকে যখন কোনো বাঙালি অপরাধের শিকার হন বা অভিযুক্ত হন, তখন প্রতিবাদের ভাষা এবং আইনের প্রয়োগ হয় একরকম। কিন্তু একই পাহাড়ের বাসিন্দা হয়েও যখন অপরাধী এবং ভিকটিম দুজনেই (ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি) উপজাতি সম্প্রদায়ের হন, তখন আইনকে পাশ কাটিয়ে অদৃশ্য শক্তির ইশারায় ‘সমঝোতা’র আশ্রয় নেওয়া হয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।