চাঁদাবাজি ও সহিংসতার অভিযোগের মধ্যেই ইউপিডিএফের ‘নৈতিক অবস্থান’ নিয়ে প্রশ্ন
![]()
মোঃ সাইফুল ইসলাম
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে আজ প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফের অপপ্রচারের মাধ্যম সিএইচটি নিউজ নামের ব্লগ সাইটে কথিত “মাদকবিরোধী অভিযান” চালিয়ে ইয়াবা পুড়িয়ে ধ্বংস করার যে প্রচার চালানো হয়েছে, সেটি বাস্তবে যতটা না সমাজসেবামূলক উদ্যোগ, তার চেয়ে অনেক বেশি একটি সুপরিকল্পিত প্রচারণা কৌশল; এ কথা বলাই যুক্তিযুক্ত। বিশেষ করে যখন এই কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে ইউপিডিএফের মত একটি সশস্ত্র সংগঠন, যার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন, সন্ত্রাস এবং মাদক সংশ্লিষ্টতার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
প্রশ্নটা খুব সরল: একটি অবৈধ সশস্ত্র সংগঠন কোন আইনের বলে “মাদকবিরোধী অভিযান” পরিচালনা করে? রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেখানে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে, সেখানে ইউপিডিএফের মতো সংগঠন নিজেরাই বিচারক, তদন্তকারী এবং শাস্তিদাতা- এই ভূমিকা গ্রহণ করছে—এটি সরাসরি আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য একটি উদ্বেগজনক চ্যালেঞ্জ।
ইউপিডিএফের এই কর্মকাণ্ডকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে এই সংগঠনটি “অধিকার আদায়”-এর নামে তরুণদের বিপথে পরিচালিত করছে—এমন অভিযোগ বহুবার উঠে এসেছে। বাস্তবতা হলো, পাহাড়ে যে অস্থিরতা, বিভক্তি এবং সহিংসতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তার পেছনে ইউপিডিএফসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান, ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন—এসব আর নতুন কিছু নয়।
এমন একটি সংগঠন হঠাৎ করে “মাদকবিরোধী অভিযানে” নেমেছে—এটি নিছক নৈতিক জাগরণ নয়, বরং জনমত প্রভাবিত করার একটি কৌশল বলেই প্রতীয়মান হয়। কারণ, যে সংগঠনের বিরুদ্ধে নিজেই মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে, তাদের মুখে মাদকবিরোধী কথা অনেকটাই আত্মবিরোধী শোনায়। বরং এটি সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে সরল-সাধারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্ত করার একটি অপপ্রয়াস হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইউপিডিএফ নিজেদের একটি “বিকল্প কর্তৃপক্ষ” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তারা বোঝাতে চায়, রাষ্ট্রের বাইরে থেকেও তারা আইন প্রয়োগ করতে সক্ষম। এটি শুধু বিপজ্জনকই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে পাহাড়ে একটি সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা তৈরির ইঙ্গিত বহন করে।
মাদক নিঃসন্দেহে একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন—এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই লড়াই অবশ্যই হতে হবে রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায়, বৈধ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এবং জবাবদিহিতার কাঠামোর মধ্যে থেকে। অবৈধ অস্ত্রধারী কোনো গোষ্ঠীর হাতে এই দায়িত্ব তুলে দেওয়া মানে সমস্যার সমাধান নয়, বরং নতুন সমস্যার জন্ম দেওয়া।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ ধরনের প্রচারণা যদি প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হবে—কে বৈধ, কে অবৈধ—এই মৌলিক সীমারেখাটিই ঝাপসা হয়ে যাবে।
অতএব, ইউপিডিএফের এই তথাকথিত “মাদকবিরোধী অভিযান”কে বাহবা দেওয়ার আগে এর পেছনের উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট এবং বাস্তবতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। অন্যথায়, পাহাড়ের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের পথে এটি আরও একটি নতুন প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।