আর এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া এমন এক সময়ে ঘটছে, মণিপুর অশান্ত এবং এই অঞ্চল ঘিরে চলছে ভূরাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশ। অন্যদিকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডে স্থানীয় মুসলিমদের উচ্ছেদ করে নতুন নতুন বসতি নির্মাণের মাধ্যমে জনতাত্ত্বিক কাঠামো পরিবর্তনের অভিযোগ উঠছে।
মূলত এ ঘটনা ঘিরে দুই ধরনের সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের দাবি, এটি ইসরাইলের দখল করা ফিলিস্তিনি ভিটেমাটিতে কৌশলে জনসংখ্যা বাড়ানোর এক সুপরিকল্পিত আয়োজন। অন্যদিকে বাংলাদেশ সংলগ্ন সেভেন সিস্টার্স ঘিরে আলাদা দেশ তৈরির গুঞ্জনের শক্তিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এ ঘটনা।
তবে এ কথা ঠিক যে, এ যাত্রায় ২৫০ ভারতীয় এই দেশত্যাগ কোনো সাধারণ অভিবাসন নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের এক অমীমাংসিত ধর্মীয় এবং জাতিগত রহস্যও।ফিরে দেখা ইতিহাস
ভারত ছেড়ে ইসরাইলে যাওয়া মানুষগুলো পরিচিত ‘বনে মেনাশে’ নামে। তাদের দাবি, তারা প্রাচীন ইসরাইলের হারিয়ে যাওয়া গোত্রের বংশধর। বাইবেলে বলা হয়েছে, ১২টি গোত্রের মানুষকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল প্রাচীন ইসরাইল। এর মধ্যে যোসেফের পুত্রদ্বয় এফ্রাইম আর মনশের থেকে জন্ম নেয় দুই গোত্র। ‘বনে মেনাশে’-রা নিজেদের সেই মনশের বংশধর বলে দাবি করেন।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অ্যাসিরিয়রা হামলা চালায় ইসরাইলে। ছন্নছাড়া হয়ে যায় ইসরাইলের ১০টি গোষ্ঠী। তাদের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার মেনাশেকে প্রাণ হাতে করে পারস্য, আফগানিস্তান, তিব্বত ও চীন পেরিয়ে চলে আসতে হয় ভারতে। তার পরে ধীরে ধীরে মণিপুর ও মিজোরামে বসতি গড়ে তোলেন তারা।
মেনাশেরা মুখের গঠনে মঙ্গোলিয়ান ছাপ। এক লহমায় অরুণাচল বা মণিপুরের মানুষদের থেকে তফাৎ করা যায় না। তাদের ভাষা তিব্বতি-বর্মি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। নৃ-বিজ্ঞানীদের মতে, তাদের আদি শিকড় বর্তমান চীনের ভূখণ্ডে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য থেকে তারা চীনের কোনো ভূখণ্ডে আসে। সেখানকার মঙ্গোলয়েড চেহারা মানুষের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে চেহারায়ও এখন সেই ধরনের ছাপ।
মণিপুরে মেনাশেদের কুকি সম্প্রদায়ের অংশ মনে করা হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মার্কিন মিশনারিদের প্রভাবে বেশির ভাগ কুকি খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়। কিন্তু মেনাশেদের অনেকেই এখনও ধরে রেখেছেন নিজেদের ধর্ম পরিচয়। নিজেদের ইহুদি সত্ত্বা। খৎনার মতো কিছু ইহুদি রীতি তারা এখনও অনুসরণ করেন।
১৯৭০-এর দশকে কয়েকজন ইসরাইলি নৃবিজ্ঞানী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আসেন। তারা এই সম্প্রদায়ের কিছু রীতিনীতির সঙ্গে ইহুদি প্রথার বেশ মিল লক্ষ্য করেন। কুকিদের কিছু মন্ত্রের সুর তাদের পরিচিত মনে হয়। তাদের লোককথায় মিশর থেকে পালানোর ঘটনার ছায়া ছিল। ভূমিকম্পের মতো বিপদের সময় তারা ‘মানাসে!’ জাতীয় একটি শব্দ উচ্চারণ করতেন। এভাবেই মেনাশে গোত্রের স্বীকৃতি পায়।
ভারত জন্মভূমি আর ইসরাইল নিয়তি
শত-শত বছর ধরে ভারতে থাকলেও এই জনগোষ্ঠী স্বপ্ন দেখতো ‘পবিত্র ভূমি’তে যাওয়ার। তাদের ভাষায়, ভারত জন্মভূমি কিন্তু ইসরাইলই নিয়তি। ওই ভূখণ্ডটিই প্রতিশ্রুত, সেখানে যেতেই হবে। ইতিহাস আর মিথলজির ধোঁয়াশা আবৃত মেনাশেদের এই বাসনা কাজে লাগিয়েছে ‘শাভেই ইসরাইল’ নামের একটি সংস্থা। তাদের হিসাবে, এই গোত্রের প্রায় ৭ হাজার সদস্য এখনও ভারতে রয়েছেন।
মেনাশেরা বলছেন, তারা ধর্মের টানেই ইসরাইলে যেতে চান। তবে, শুধু ধর্মই এই স্থানান্তরের একমাত্র কারণ নয়। এর পেছনে কাজ করছে মণিপুরের দারিদ্র্য ও দীর্ঘদিন ধরে চলমান জাতিগত সংঘাত।
স্পর্শকাতর সেভেন সিস্টার্সে ইসরাইল যোগ
সেভেন সিস্টার্স এমনিতেই নানা কারণে অশান্ত থাকে। তার উপর আগামী দিনে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মিয়ানমার এবং চীন ভারত সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে এ অঞ্চল। এর মাঝেই আবার হঠাৎ করে এখানে ইসরাইল সংশ্লিষ্টতায় সিদুরে মেঘ দেখছে অনেকে বিশ্লেষক। তারা বলছেন ধর্মকে কেন্দ্র এখানকার বিচ্ছিন্নতাবাদি লড়াইয়ে ইসরাইল যদি কোনো পক্ষ নেয় তবে জল আরও ঘোলাটে হবে।
ধর্মের আড়ালে অর্থনীতির প্যাঁচ
২০০৫ সালের আগে ইসরাইলে স্থানান্তরিতদের অনেকেই পশ্চিম তীরের হেবরন এবং গাজার ইসরাইলি বসতিগুলোতে আবাস গড়েছিল। গত বছরের নভেম্বরে ইসরাইল সরকার ভারতে থাকা বাকি মেনাশেদের একসঙ্গে অভিবাসনের সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারই অংশ হিসেবে, এই ২৫০ জন মেনাশের ভারত থেকে চিরতরে ইসরাইল যাত্রা। এদের খরচের একটি অংশ নেতানিয়াহু সরকারই বহন করছে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই অর্থায়নকে ‘গুরুত্বপূর্ণ জায়নবাদী সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এই স্থানান্তর যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইসরাইলের উত্তরের গালিল অঞ্চলকে আরও শক্তিশালী করবে।
এছাড়াও, ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে ইসরাইলের শ্রমশক্তিতে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অনেক ইসরাইলি সেনাদলে যোগ দিয়েছেন বা রকেট হামলার কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের নিয়মিত কাজ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নেপাল ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো থেকে প্রবাসী শ্রমিকও কমে গেছে। ফলে অর্থনীতি সচল রাখতে মরিয়া ইসরাইল এখন মেনাশেদের মতো গোষ্ঠীগুলোকে স্বাগত জানাচ্ছে।
দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে বিশেষ বিমানে তাদের নিরাপদে তেল আবিবে নিয়ে যায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী। মেনাশে গোত্রের এই দলটি ইসরাইলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে অবতরণ করলে, পতাকার রঙে সাজানো নীল-সাদা বেলুনের তোরণ সাজিয়ে-ইহুদি গান গেয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়।
ইসরাইলের অভিবাসনমন্ত্রী ওফির সোফার এই ঘটনাকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের জন্য ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলে বসতি স্থাপন করা হবে।
তবে, এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার নেপথ্যে ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর এক গভীর চাল দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ফিলিস্তিনের বুক চিরে গড়ে তোলা অবৈধ বসতিগুলোতে মানুষের আকাল ঘোচাতে ‘শেকড়ের সন্ধানে’ থাকা সহজ-সরল মানুষদের টেনে নিচ্ছে ইসরাইল।শেকড়ের টানে ইসরাইলি দাবার ঘুঁটি
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলের এই ‘নিরাপত্তার অজুহাত’ আসলে দীর্ঘমেয়াদী জনতাত্ত্বিক কৌশলের অংশ। ইসরাইলি আইন ‘ল অব রিটার্ন’ ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইহুদিদের নিয়ে আসা হলেও, কয়েক প্রজন্ম ধরে বাস করা ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের নিজ ভূমিতে ফেরার আন্তর্জাতিক আইন স্বীকৃত অধিকার ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করা হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, ভারতে মেনাশেদের অনেকেই দীর্ঘকাল খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত ছিলেন। অথচ ইসরাইলে পৌঁছানোর পর তাদের প্রথম শর্ত দেয়া হয়েছে— নাগরিকত্ব পেতে হলে ইহুদি হতে হবে।
ধর্মের এই রূপান্তর আর হাজার মাইল দূরের এক কাল্পনিক শেকড়ের টানে যাত্রা এক রহস্যময় আধ্যাত্মিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারতের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা মানুষগুলো কি সত্যিই হারানো ইতিহাস ফিরে পাবেন, নাকি ইসরাইলি বাহিনীর রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হয়ে হারিয়ে যাবেন মধ্যপ্রাচ্যের বারুদের ধোঁয়ায়?
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
একইসঙ্গে, মণিপুরে প্রায় তিন বছর ধরে চলমান প্রাণঘাতী জাতিগত সহিংসতার প্রেক্ষাপটে অনেকের জন্য ইসরাইলে স্থানান্তর নতুন জীবনের সম্ভাবনাও তৈরি করছে। বিশেষত: মণিপুরের মাথাপিছু আয় বছরে মাত্র ১২০০ ডলার আর ইসরাইলের মাথাপিছু আয় ৫৫ হাজার ডলারের বেশি। অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জীবন কে না চায়?
একদিকে যখন কোনো গোষ্ঠীর নিরাপত্তার কথা বলে হাজার মাইল দূর থেকে সরিয়ে আনা হচ্ছে, তখন নিজ ভূমিতে থাকা ফিলিস্তিনি মুসলিমদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা কেন পদদলিত হবে? এই বৈষম্যমূলক নীতি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত এই জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের নেপথ্য উদ্দেশ্যগুলো খতিয়ে দেখা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়া।