সীমান্ত সুরক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈধ জমিতে বিজিবি ক্যাম্প নির্মাণে উপজাতিদের আপত্তি কেন?
![]()
নিউজ ডেস্ক
পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার দুর্গম সীমান্তবর্তী এলাকা পানছড়িতে নতুন একটি বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে একটি উপজাতি স্বার্থান্বেষী মহল এই ক্যাম্প স্থাপনের বিরোধিতা করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা, ভূমির মালিক এবং সংশ্লিষ্ট কার্বারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার অনুমোদিত ও বৈধ জমিতেই এই ক্যাম্প নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের এই উদ্যোগকে স্থানীয় জনগণের একটি বড় অংশ ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং এ জন্য বিজিবির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
পানছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এসব এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম থাকায় নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্তকে অনেকেই সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যে জমিতে ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে সেটি ২৪২ নম্বর পুজগাং মৌজার অন্তর্ভুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট জমির মালিক ও এলাকার কার্বারী রাখিমনি ত্রিপুরা এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জমি বৈধভাবে নির্ধারিত এবং স্থানীয়ভাবে স্বীকৃত। তিনি জানিয়েছেন, জমি নিয়ে যে ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে তার বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের স্বার্থে এই উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের জন্য উপকারী হবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদি অনুমোদিত ও বৈধ জমিতে স্থানীয়দের সম্মতিতে একটি নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়, তাহলে একটি বিশেষ মহল কেন এর বিরোধিতা করছে? স্থানীয়দের একাংশ মনে করেন, এর পেছনে কেবল জমি বা পরিবেশগত কোনো উদ্বেগ নয়, বরং অন্য কিছু স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে।
অনেক স্থানীয় বাসিন্দার মতে, সীমান্ত এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হবে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চোরাচালান, অবৈধ বাণিজ্য, সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। নতুন বিজিবি ক্যাম্প চালু হলে এসব কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়বে এবং অপরাধীদের জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে নিজেদের প্রভাব ও আধিপত্য বজায় রাখতে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেন। তাদের মতে, প্রকৃত পরিস্থিতি না জেনে অনেকেই এসব প্রচারণার প্রভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
পানছড়ি ও আশপাশের এলাকার অনেক বাসিন্দা মনে করেন, সীমান্ত এলাকায় রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়া মানে কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া নয়; এটি উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি বিজিবি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হলে নিয়মিত টহল কার্যক্রম বৃদ্ধি পাবে, সীমান্তে নজরদারি জোরদার হবে এবং স্থানীয় জনগণ দ্রুত নিরাপত্তা সহায়তা পাবে। ফলে পাহাড়ি ও বাঙালি নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সীমান্ত অঞ্চলে রাষ্ট্রের কার্যকর উপস্থিতি না থাকলে সেখানে অবৈধ শক্তির উত্থান ও আধিপত্য বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশেও সীমান্ত সুরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিজিবির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় পানছড়ির মতো সংবেদনশীল এলাকায় নতুন ক্যাম্প স্থাপনকে অনেকেই জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয় জনগণের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে কিছু গোষ্ঠী অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বা সংগঠিত শক্তির মাধ্যমে এলাকায় নিজেদের প্রভাব বজায় রেখেছে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার হলে এসব গোষ্ঠীর প্রভাব কমে আসবে। ফলে সাধারণ মানুষ আরও স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে এবং নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাবে। এ কারণেই কিছু গোষ্ঠী বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের বিরোধিতা করছে বলে তারা মনে করেন।
তবে স্থানীয়দের মতে, যেকোনো বিষয়ে মতভেদ বা আপত্তি থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু সেই মতভেদ যদি তথ্যভিত্তিক না হয়ে অপপ্রচার, গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে, তাহলে তা জনস্বার্থের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। তাই তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রকৃত তথ্য যাচাই করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
এলাকার বাসিন্দারা আরও বলেন, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষের প্রধান চাওয়া হলো নিরাপত্তা, শান্তি এবং স্থিতিশীলতা। তারা চান তাদের সন্তানরা নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠুক, কৃষকরা নিশ্চিন্তে জমিতে কাজ করুক এবং ব্যবসায়ীরা ভয়ভীতি ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারুক। নতুন বিজিবি ক্যাম্প এসব লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে তারা আশা করছেন।
অনেকের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনগণ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। কোনো উদ্যোগকে কেন্দ্র করে অযথা বিভাজন সৃষ্টি না করে বাস্তবতা ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। সীমান্ত নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করেন তারা।
সবশেষে স্থানীয় জনগণ ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে, পানছড়ি সীমান্তে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনকে ঘিরে ছড়ানো নানা তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখা উচিত। বৈধ জমিতে, আইনানুগ প্রক্রিয়ায় এবং স্থানীয়দের সম্মতিতে পরিচালিত কোনো নিরাপত্তামূলক উদ্যোগকে ভুল তথ্যের মাধ্যমে বিতর্কিত করার চেষ্টা না করে জাতীয় স্বার্থ, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সীমান্ত রক্ষা এবং জনগণের শান্তিপূর্ণ বসবাস নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত উদ্যোগগুলোকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করার পাশাপাশি অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থেকে সতর্ক থাকারও আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।