ফেনীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণে মেগা প্রকল্প, নির্মাণে সেনাবাহিনীকে চান স্থানীয়রা
![]()
নিউজ ডেস্ক
দীর্ঘদিনের বন্যা দুর্ভোগ থেকে ফেনীবাসীকে স্থায়ীভাবে রক্ষার লক্ষ্যে ফেনীর মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়) শীর্ষক একটি বৃহৎ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রায় এক হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এ প্রকল্পকে জেলার ইতিহাসে অন্যতম বড় পানি ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিজনিত আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প অনুমোদনের খবরে ফেনীজুড়ে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার হয়েছে। সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, অস্থায়ী সংস্কার নয়, দুর্নীতিমুক্ত ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ।
স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হলে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত হবে এবং দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে।
ফেনীতে প্রায় প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল ২০২৪ সালের আগস্টে। ওই বন্যায় অন্তত ২৯ জন প্রাণ হারান। জেলার পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, সদর ও সোনাগাজী উপজেলার লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় উপজেলা ও জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ। তলিয়ে যায় হাজার হাজার একর কৃষিজমি, ভেসে যায় মাছের ঘের ও পুকুর, ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্রামীণ সড়ক, সেতু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও বসতঘর। প্রতিবছরের বন্যায় নদীগুলোতে অতিরিক্ত পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার, নদী পুনঃখনন, বাঁধ পুনর্বাসন এবং নদীতীর সংরক্ষণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। একইসঙ্গে কৃষি, সেচ ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি নদীভাঙন, দখল এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ প্রকল্প।
অনুমোদিত প্রকল্পে ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ (টো-প্রোটেকশনসহ), ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ২৭টি বিদ্যমান সেচ অবকাঠামোর পুনর্বাসন, ৭৭টি ইনলেট নির্মাণ এবং একটি হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামোও গড়ে তোলা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ফেনীর সদর, ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া ও সোনাগাজী উপজেলার কৃষিজমি, বসতভিটা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামোসহ প্রায় ১৪ হাজার ২০৯ কোটি টাকার সম্পদ সুরক্ষিত হবে। একইসঙ্গে প্রায় তিন লাখ ৭১ হাজার ৭৩৫ টন কৃষিপণ্য, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মৎস্য ও পোল্ট্রি উৎপাদন বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা নিরাপদ হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম শামীম বলেন, প্রতিবছর বর্ষা এলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। বারবার বাঁধ মেরামত করা হলেও তা টেকে না। এবার যদি সাধারণ ঠিকাদারি ব্যবস্থায় আগের মতো কাজ হয়, তাহলে আবারও একই দুর্ভোগে পড়তে হবে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কাজ হলে দুর্নীতির সুযোগ কমবে এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণ সম্ভব হবে।
আরেক বাসিন্দা জহিরুল হক রাজু বলেন, বর্ষা আসে, বন্যা হয়, বাঁধ ভাঙে, আবার সংস্কার হয়। বছরের পর বছর একই চক্র চলছে। এবার যদি প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না।
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, তারা আর ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চান না। তাদের প্রয়োজন এমন একটি স্থায়ী ও বিজ্ঞানভিত্তিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও নিরাপত্তা দেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং, নদীতীর সংরক্ষণ এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণই নয়, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে আসবে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, সরকার ফেনীর মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে। এটি সুষ্ঠু ও পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আকস্মিক বন্যার ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমে আসবে। ফেনীর অবকাঠামো ও কৃষিসহ প্রায় ১৪ হাজার ২০৯ কোটি টাকার সম্পদ সুরক্ষিত হবে। আমরা সর্বোচ্চ সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করব।
ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুন্সি রফিকুল আলম মজনু বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন। দ্রুত কাজ শুরু হলে ফেনীর উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বন্যা দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান হবে বলে আমরা আশাবাদী।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অতীতের মতো যেন এই প্রকল্পও অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের শিকার না হয়। সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করলে ফেনীর মানুষের বহু দশকের বন্যা-দুর্ভোগের অবসান ঘটবে এবং জেলার কৃষি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।