কক্সবাজারে বন্যার পানি কমলেও দুর্ভোগের শেষ নেই

কক্সবাজারে বন্যার পানি কমলেও দুর্ভোগের শেষ নেই

কক্সবাজারে বন্যার পানি কমলেও দুর্ভোগের শেষ নেই
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

তারেকুর রহমান, কক্সবাজার

টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আজও কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। জেলার ১০ উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম এখনো পানির নিচে।

জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আড়াই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও নতুন গঠিত মাতামুহুরী উপজেলা।

এছাড়া সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিভিন্ন এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। শত শত বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক ডুবে থাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় বাড়ছে দুর্ভোগ।

কক্সবাজারে বন্যার পানি কমলেও দুর্ভোগের শেষ নেই

চকরিয়ার কাকারা এলাকার বাসিন্দা আহমদ‌ শরীফ বলেন, “পাঁচ দিন ধরে ঘরের ভেতরে পানি। বিছানা, কাপড়চোপড়, চাল-ডাল সব নষ্ট হয়ে গেছে। পানি একটু কমলেও ঘরে থাকা যাচ্ছে না। কাদা আর দুর্গন্ধে খুব কষ্টে আছি।”

গৃহিণী রাশেদা বেগম বলেন, “ছোট ছোট সন্তান নিয়ে খুব দুর্ভোগে আছি। রান্না করার জায়গা নেই, বিশুদ্ধ পানিরও সংকট। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শুকনো খাবার আর নিরাপদ পানির ব্যবস্থা।”

পেকুয়া উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, “রাস্তা ডুবে থাকায় কোথাও যেতে পারছি না। বাজার বন্ধ। ঘরে যে খাবার ছিল তাও প্রায় শেষ। পানি নামলেও স্বাভাবিক হতে আরও অনেক সময় লাগবে।”

কক্সবাজারে বন্যার পানি কমলেও দুর্ভোগের শেষ নেই

রওশন আরা বলেন, “বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে, কিন্তু ঘরে পুরু কাদা জমে আছে। আসবাবপত্রের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখন ঘর পরিষ্কার করা আর নতুন করে সংসার গোছানোই সবচেয়ে বড় চিন্তা।”

মাতামুহুরী এলাকার কৃষক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, “আমার ধান ও সবজির ক্ষেত পুরো পানির নিচে ছিল। পানি কমলেও ফসলের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। এবার কীভাবে সংসার চলবে, সেটাই বুঝতে পারছি না।”

গৃহবধূ সেলিনা আক্তার বলেন, “বাচ্চাদের নিয়ে কয়েক দিন আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলাম। এখন বাড়িতে ফিরলেও বসবাসের মতো পরিবেশ নেই। ঘরে কাদা, নোংরা আর পানির কারণে অনেক জিনিসপত্র ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদের সহযোগিতা খুব প্রয়োজন।”

কক্সবাজারে বন্যার পানি কমলেও দুর্ভোগের শেষ নেই

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও লঘুচাপের প্রভাবে আগামী দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং পাহাড়ধসের ঝুঁকি রয়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, বান্দরবান থেকে নেমে আসা ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি মানুষ। দুর্গত মানুষের সহায়তায় সরকারিভাবে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

কক্সবাজারে বন্যার পানি কমলেও দুর্ভোগের শেষ নেই

তিনি আরও বলেন, শনিবার সকাল থেকে কক্সবাজারের বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করা হয়। এসময় বিভিন্ন গ্রামের পানিবন্দি মানুষের মাঝে ত্রাণ ও ঔষধ সামগ্রী বিতরণ করেন। পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে শনিবার (১১ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী নৌঘাট থেকে ১৪০ জন যাত্রী তিনটি ট্রলার সেন্টমার্টিন যায়। বিকেল ৩টার দিকে যাত্রীসহ ট্রলারগুলো নিরাপদে সেন্টমার্টিনে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছেন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম।

কক্সবাজারে বন্যার পানি কমলেও দুর্ভোগের শেষ নেই

তিনি বলেন, উত্তাল সমুদ্রের কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে গত ১০ দিন ধরে যাত্রীবাহী ট্রলার ও সাধারণ নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল। এতে চিকিৎসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা ও জরুরি কাজে টেকনাফে এসে আটকা পড়েন সেন্টমার্টিনের দেড় শতাধিক বাসিন্দা। দীর্ঘদিন হোটেল ও স্বজনদের বাড়িতে অবস্থান করতে গিয়ে তাদের অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে শনিবার আটকে থাকা ১৪০ জন বাসিন্দাকে তিনটি ট্রলারে করে সেন্টমার্টিনে পৌঁছায়। একই সঙ্গে দ্বীপের বাসিন্দাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীও পাঠানো হয়েছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, গত ২৪ ঘন্টায় মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ শনিবার দুপুর ৩ টা পর্যন্ত ৫১ মিলিমিটার।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *