বন্যার ধাক্কায় কক্সবাজারে সবজির দাম কেজিতে বেড়েছে ৪০ থেকে ১০০ টাকা
![]()
তারেকুর রহমান, কক্সবাজার
সাম্প্রতিক বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও এর প্রভাব এখন স্পষ্ট কক্সবাজারের কাঁচাবাজারে। টানা বৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যার প্রভাবে চকরিয়া, পেকুয়া, ঈদগাঁও ও জেলার বিভিন্ন কৃষি এলাকায় বন্যার পানিতে সবজির খেত তলিয়ে যাওয়া, উৎপাদন কমে আসা এবং সরবরাহে ঘাটতির কারণে জেলার প্রায় সব ধরনের সবজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কোথাও এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৩০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রেতারা। অনেকেই আগের মতো একসঙ্গে কয়েক ধরনের সবজি না কিনে প্রয়োজন মেটাতে অল্প পরিমাণে কিনে বাড়ি ফিরছেন।
শনিবার (২৫ জুলাই) সরেজমিনে কক্সবাজার বড় বাজার, বাহারছড়া বাজার, কালুর দোকান বাজার, কলাতলী ও শহরের বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি দোকানেই ক্রেতারা সবজির দাম শুনেই অনেকে পরিমাণ কমিয়ে কিনছেন। কেউ এক কেজির বদলে আধা কেজি, আবার কেউ আধা কেজির বদলে ২৫০ গ্রাম করে সবজি কিনছেন।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, বন্যার আগে প্রতি কেজি শসা ৪০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন ১২০ টাকা। বরবটি ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৪৫ টাকা থেকে ১৭৫ টাকা, পটল ২৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা, বেগুন ৪০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, করলা ৭০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা, চিচিঙ্গা ৪০ টাকা থেকে ৮০ টাকা, ঝিঙে ১২০ টাকা, কাঁকরোল ৮০ থেকে ১২০ টাকা, পেঁপে ৪০ থেকে ৮০ টাকা এবং ঢেঁড়স ৪০ টাকা থেকে বেড়ে মানভেদে ৬০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষিত হওয়ায় টমেটো ১২০ টাকা, আলু ৫০ টাকা এবং গাজরের দাম ১২০ টাকায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

কক্সবাজার শহরের পশ্চিম পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী লিজা বেগম বলেন, “আগে একসঙ্গে পাঁচ-ছয় রকম সবজি কিনতাম। এখন দুই-তিন রকম কিনেই বাজার শেষ করতে হচ্ছে। সবজির দামও এখন মাছ-মাংসের মতো হয়ে গেছে।”
কালুর দোকান এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “এক সপ্তাহ আগে ৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া লাউ এখন বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়।
বন্যায় কৃষকের ক্ষতি হয়েছে, সেটা বুঝি। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন বাজারে এসে নতুন দামের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।”
কামাল উদ্দিন বলেন, “বাজারে এখন ১০০ টাকার নিচে ভালো কোনো সবজি নেই বললেই চলে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে টাকায় সপ্তাহের বাজার করতাম, এখন একই বাজার করতে ৪০০-৫০০ টাকা বেশি লাগছে। এভাবে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
ক্রেতা শফিকুর রহমান বলেন, “গত সপ্তাহেও ৫০ টাকায় এক কেজি বেগুন আর ৪০ টাকায় ঢেঁড়স কিনেছি। এখন একই বেগুন ১৪০ টাকা আর ঢেঁড়স ১২০ টাকা কেজি কিনতে হচ্ছে। দাম এত বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো এক কেজি করে নিতে পারছি না, আধা কেজি করেই কিনতে হচ্ছে।”
কলাতলী এলাকার নাসিমা আক্তার বলেন, “কয়েকদিন আগে বরবটি ৪০ টাকা আর কাঁচামরিচ ৪৫ টাকা কেজি ছিল। এখন বরবটি ১৩০ টাকা ও কাঁচামরিচ ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা কেজি। সংসারের বাজেট ঠিক রাখতে বাধ্য হয়ে কম পরিমাণে সবজি কিনছি।”
কক্সবাজার শহরের মায়ের দোয়া সবজি বিতানের স্বত্বাধিকারী আব্দুল কাদের বলেন, “আমাদের দোকানের বেশিরভাগ সবজি আসে চকরিয়ার দিক থেকে। কিন্তু বন্যার কারণে অনেক ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষকেরা সবজি তুলতে পারেননি। ফলে বাজারে সরবরাহ অনেক কমে গেছে। আড়ত থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে খুচরা বাজারেও দাম বেড়েছে।”

কালুর দোকান এলাকার সালাম সবজি বিতানের স্বত্বাধিকারী সালামত উল্লাহ বলেন, “আগের মতো পর্যাপ্ত সবজি এখন আড়তে পাওয়া যাচ্ছে না। যা পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আমরা বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করতে পারি না। তাই বাধ্য হয়েই বাড়তি দামে বিক্রি করছি।”
কক্সবাজার বড় বাজারের সবজি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাছান বলেন, “চকরিয়া, পেকুয়া ও আশপাশের কৃষি এলাকায় বন্যার কারণে সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে দাম বেড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না আসা পর্যন্ত দ্রুত দাম কমার সম্ভাবনা নেই।”
বাহারছড়া বাজারের ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান বলেন, “প্রতিদিন আড়তে গিয়ে আগের দিনের চেয়ে বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এবং কৃষকেরা আবার নিয়মিত বাজারে সবজি পাঠাতে পারলে দাম কিছুটা কমবে বলে আশা করছি।”
ব্যবসায়ীরা জানান, বন্যার কারণে চকরিয়া, পেকুয়া, ঈদগাঁও ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকার সবজিখেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কোথাও ক্ষেত তলিয়ে গেছে, কোথাও নষ্ট হয়েছে প্রস্তুত ফসল। ফলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়লে বাজারে দামের চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে তাদের আশা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক খবরের কাগজকে বলেন, “সাধারণত বর্ষাকালে প্রাকৃতিকভাবেই সবজির সরবরাহ কিছুটা কম থাকে। এর ওপর চলমান বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে বিভিন্ন ধরনের সবজির উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাজারে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ কারণেই বর্তমানে অধিকাংশ সবজির দাম বেড়েছে। উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বাজারেও সবজির দামে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “চলমান বন্যায় জেলার কৃষি খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়া প্রায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য মৌসুমি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন করে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাদের বীজ, সারসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ দিয়ে দ্রুত পুনরায় আবাদে ফিরিয়ে আনতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।”
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।