পাহাড়ের একজন অনন্য দিকপাল- শরদিন্দু শেখর চাকমা

পাহাড়ের একজন অনন্য দিকপাল- শরদিন্দু শেখর চাকমা

পাহাড়ের একজন অনন্য দিকপাল- শরদিন্দু শেখর চাকমা

শরদিন্দু শেখর চাকমা

“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

মোঃ সাইফুল ইসলাম

পৃথিবীর অধিকার-বঞ্চিত যে ভিক্ষুকের দল-,
জীবনের বন্যাবেগে তাদের কর বিচঞ্চল।
অসত্য অন্যায় যত ডুবে থাক, সত্যের প্রসাদ
পিয়ে লভ অমৃতের স্বাদ।
অজস্র মৃত্যুরে লঙ্ঘি হে নবীন, চল অনায়াসে
মৃত্যুঞ্জয়ী জীবন-উল্লাসে।

শরদিন্দু শেখর চাকমা, যিনি এসএস চাকমা নামে সমধিক পরিচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। তার ছাত্রজীবনে লেখা-পড়া ও কঠোর পরিশ্রমের কাহিনী আজো পার্বত্য অঞ্চলে কিংবদন্তি হয়ে ঘরে ঘরে অনুপ্রেরণার উৎস। এসএস চাকমা একজন মানবকল্যান প্রতিক, সত্যের সাধক, ইতিহাসবিদ, জীবনবিদ লেখক, সফল কুটনীতিক ও সমাজ সেবক। তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল জীবন-যাপনে অভ্যস্ত একজন বিরল সৎ সরকারি কর্মকর্তা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নির্লোভ, মেধাবী, পরোপকারী একজন সৎ মানুষ। শরদিন্দু নামের মাঝেই লুকিয়ে আছে তার জীবন চরিত্রের মাহাত্ন। শরদিন্দু অর্থ শরৎকালের চাঁদ। শরতের শুভ্রতা আর তাপহীন সৌন্দর্যের চেতনার প্রতিক তার নামের মতোই তিনি যেন মেঘের পরে রোদের তাপ। তিনি একাধারে মানবকল্যাণে ব্রত, অন্যদিকে হিংসায় উন্মাদ মানুষের প্রতি রোদ্রমূর্তি।

ছোটবেলা থেকেই তিনি সৎ ও পরোপকারী ছিলেন। তার কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন অথচ পাননি এমন নজির নেই বললেই চলে। তার নিজের সক্ষমতা ও প্রশাসনিক ক্ষমতা থেকে তিনি আজীবন মানুষের উপকার করে গেছেন। তিনি যখন তার পেশা জীবনে প্রবেশ করেন তখন কক্সবাজার কর্মরত থাকাকালে তাকে এক ব্যক্তি ঘুষ প্রদান করতে গেলে ঐ ব্যক্তিকে তিনি পুলিশের হাতে তুলে দিয়েও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। এসএস চাকমার মানুষকে ভালোবাসার আবেগ, রাজনৈতিক শিষ্ঠাচার সবই আছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর জন্য যে কাজগুলো করেছেন, অনেক ছেলে-মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলেছেন, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এমনকি এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর জন্য অনেক কাজ করে চলেছেন। প্রকৃত সৎ সাহস, কুটনৈতিক প্রজ্ঞা, সাধাসিধে জীবন, সবমিলিয়ে তিনি একজন বিরল মানুষ। কর্মজীবনে এবং অবসর জীবনে সবসময়ই তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া লেখা-পড়ার বিষয়ে তিনি খুবই সহযোগীতা এবং বেশ কয়েকজন ছেলে-মেয়েকে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করতেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পশ্চাৎপদ সাধারন এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহন করেও নিজ চেষ্টায় সব বাঁধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে সরকারি চাকরিতে ক্ষুদ্র-নৃ গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথম অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন শরদিন্দু শেখর চাকমা। পরবর্তীকালে ক্ষুদ্র-নৃ গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবেও তিনি নিয়োগ পান।

শরদিন্দু শেখর চাকমা বলেন, ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে উন্নীত হওয়ার পর তিনি খাগড়াছড়ি জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি হন। খাগড়াছড়ি সদর হলো তার গ্রাম থেকে ২৫ মাইল দূরে। ওখানে ৮ম শ্রেনী পাস করে রাঙামাটিতে ভর্তি হন। রাঙামাটিও তাদের বাড়ি থেকে ১৪ মাইল দূরে। পরবর্তীতে স্যার আশুতোষ কলেজ, রাঙ্গুনিয়া থেকে মাধ্যমকি পাশ করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। চাকমাদের মধ্যে তিনিই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হন।

এসএস চাকমার জন্ম রাঙামাটি পার্বত্য জেলার নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট মৌজার খুলনাবিল নামক গ্রামে তার নানা বাড়িতে। বর্তমানে এই গ্রামটি কাপ্তাই হ্রদের নীচে তলিয়ে গেছে। ঠিক কত তারিখে বা কত সালে তিনি জন্মগ্রহন করেছিলেন তা জানা যায়নি। তার বাবা-মা একবারেই নিরক্ষর ছিলেন, তাই তার আসল জন্মতারিখ, সাল জানা কোথাও লিপিবদ্ধ নেই। তার পিতা ফুলরাজ চাকমা ও মা তনাবি চাকমা। অসাধারণ ও দূর্দান্ত মেধাবী এই মানুষটির প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় বুড়িঘাট প্রাইমারি স্কুল থেকে। ঐ স্কুলের ২য় শ্রেনীর পরীক্ষায় তিনি প্রথম গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছিলেন। এরপর ৪র্থ শ্রেনীতেও বৃত্তি পেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে এসএস চাকমা খাগড়াছড়ি জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে তিনি রাঙামাটি সরকারি হাই স্কুলে নবম শ্রেনীতে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে তিনি এসএসসি পাশ করেন। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার স্যার আশুতোষ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৮ সালে তিনি বিএ অনার্স এবং ১৯৫৯ সালে এমএ ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের ২য় এমএ ডিগ্রী অর্জনকারী ব্যক্তিত্ব।

এসএস চাকমা শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। চাকরি জীবনের শুরুতে ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে সিলেট জেলায় যোগদান করেন তিনি। পরে গাইবান্ধা, রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় চাকরি করেন। এছাড়াও সময়ের সাথে সাথে তার পদোন্নতি হতে থাকে। নিজ যোগ্যতা বলে তিনি ১৯৯৩ সালে পাহাড়ী ক্ষুদ্র- নৃ গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হিসাবে বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিবের পদ অলঙ্কিত করেন। পদোন্নতির ২য় মাসে তাকে পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের অধীনে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমীর প্রিন্সিপাল হিসেবে পদায়ন করা হয়। নিজ কর্মগুণে গুনান্বিত ব্যক্তি এসএস চাকমা ১৯৯৪ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহন করেন। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক গঠিত জাতীয় কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি ভূটানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হন।

বিবাহের পরে তার সকল কাজের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন তার স্ত্রী। তিনি এক পুত্র ও চার কণ্যা সন্তানের জনক। তার সন্তানেরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী, দেশ-বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত। তারাও তাদের বাবার মতো মানব সেবায় নিয়োজিত।

সাংসারিক কাজে তিনি স্ত্রীকে সহযোগীতা করতেন। পরিবারের, ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারে তার অগাধ ভালোবাসা ছিলো। অন্যায়ের সাথে কখনো আপোষ করতেন না।

মানবকল্যাণে তার অবদান সমূহ:
বান্দরবান কলেজ ও খাগড়াছড়ি কলেজ জাতীয়করণসহ খাগড়াছড়ি হাই স্কুল জাতীয়করণে তার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন। ঢাকায় পাহাড়ী হোস্টেল বরাদ্দকরণ, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে উপজাতি কোটা সংরক্ষন, সরকারি চাকরিতে উপজাতি কোটা সংরক্ষন, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের ক্ষেত্রে চাকরীতে নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলকরণ, রাঙামাটি জেলায় নার্সিং স্কুল স্থাপনের উদ্যোগ, রাঙামাটি পিটিআই ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, ঢাকায় শাক্যমনি বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, ক্ষুদ্র-নৃ গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জন্য বিদেশী স্কলারশিপ প্রাপ্তির ব্যবস্থাসহ আরো অন্যান্য ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য।

এসএম চাকমার জীবনে সুযোগের ক্ষেত্র যখনই তৈরী হয়েছে তিনি তখনই তা যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছেন। তিনি সুযোগকে বৃহত্তর স্বার্থে ও বৃহত্তর কল্যাণে সর্বত্রভাবে কাজে লাগানোর জন্য সচেষ্ট ছিলেন। অধিকার বঞ্চিত ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বার অধিকার আদায়ে তিনি সবসময় প্রতিবাদ মূখর। তিনি বাংলাদেশ ও ভূটানের মাঝে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন। একজন সফল কুটনৈতিক হিসেবে দেশের পক্ষে ভূটানের সমর্থন নিতে পেরেছিলেন, যা জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রেখেছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।

এসএস চাকমা অবসরের পরেই লেখালেখির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক অজানা অধ্যায় উন্মোচিত করেছেন, সেখানে মানুষের কষ্টকে খুব সহজভাবে তুলে ধরেছেন। তার লেখনীতে অনেকটা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় স্বোচ্চার ছিলো। তিনি এ পর্যন্ত ৩৬টি বই লিখেছেন। তার মধ্যে ভ্রমনকাহিনী বইয়ের সংখ্যা ৬টি, ধর্মীয় ১টি। তার বই সমূহের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আমার জীবন, পার্বত্য চট্টগ্রামের একাল-সেকাল, জুম্ম জনগনের ইতোকথা, স্বাধীনতার ৪০ বছর- প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি, আমরা এদেশর নাগরিক এদেশেই থাকতে চাইসহ আরো অন্যান্য বই। তিনি লেখক হিসেবে বাংলা একাডেমীর আজীবন সদস্য এবং উত্তরা সাহিত্য পরিষদের একজন সদস্য। কলমের মাধ্যমে জ্ঞান বিতরণ করে তিনি বিভিন্ন পুরষ্কার পেয়েছেন। তার সবচেয়ে বড় পুরষ্কার হলো, তিনি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছেন।

একসময় শিক্ষার আলো বঞ্চিত দক্ষিন-পূর্বাঞ্চলের ৫ হাজার ৯৩ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন উন্নত যাদের জন্য, তাদের মধ্যে অন্যতম শরদিন্দু শেখর চাকমা। অশিক্ষায়-কুশিক্ষায়, আকন্ঠে নিমজ্জিত ও সামন্ত প্রভুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ একটি অনগ্রসর সমাজ ব্যবস্থা থেকে বেড়ে উঠা একজন ব্যক্তিত্ব তিনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষগুলোর জন্য একজন অনুকরণীয় প্রতিক হিসাবে সবার হৃদয়ের গভীরে অনন্তকাল থাকবেন তিনি।

হে মৃত্যুঞ্জয়ী কালপুরুষ
তোমাদের পদধুলায় ধন্য এই বীরভূমি,
তোমরা অসীমের মহাকৃপা,
তোমরা স্বর্গ শরদিন্দু
আমরা তোমাদেরই পদচিহ্নে যাবো বার বার চুমি।