সোনালি সম্ভাবনার পথে বরকলের হলুদ, সার সংকটে শঙ্কায় হাজারো জুম চাষি

সোনালি সম্ভাবনার পথে বরকলের হলুদ, সার সংকটে শঙ্কায় হাজারো জুম চাষি

সোনালি সম্ভাবনার পথে বরকলের হলুদ, সার সংকটে শঙ্কায় হাজারো জুম চাষি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

রাঙামাটির দুর্গম বরকল উপজেলায় চলতি মৌসুমে জুমভিত্তিক হলুদ চাষে বাম্পার ফলনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর পাহাড়ি মাটি এবং কৃষকদের নিরলস পরিশ্রমে এ বছর অধিকাংশ জুমে হলুদের গাছ সবল ও স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠেছে। তবে আশাব্যঞ্জক এই সম্ভাবনার মাঝেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরিয়া সারের সংকট ও সংগ্রহে জটিলতা। কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সার সহজে জুমে নিতে না পারায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর হলুদের ফলন অনেক ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাহাড়ের ঢালজুড়ে সবুজ হলুদের ক্ষেত কৃষকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে বরকল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলুদ উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।

কিন্তু সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ায় সার পরিবহন ও সংগ্রহে নানা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে কৃষকদের। স্থানীয়দের ভাষ্য, নিজেদের অর্থে সার কিনলেও তা জুমে নিয়ে যেতে বিজিবি ক্যাম্পে আবেদন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রত্যয়ন এবং কৃষি কর্মকর্তার সুপারিশসহ একাধিক ধাপ অনুসরণ করতে হয়। এসব প্রক্রিয়া অনেক কৃষকের কাছেই জটিল ও সময়সাপেক্ষ।

কৃষকদের দাবি, একটি মাঝারি আকারের হলুদের জুমে প্রায় ৫০০ কেজি ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়। অথচ একবারে মাত্র ৫০ কেজি পর্যন্ত সার বহনের সুযোগ থাকায় একই জমির জন্য বারবার যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে সময়, শ্রম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, সময়মতো প্রয়োজনীয় সার ব্যবহার করতে না পারলে ফলনের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। ফলে বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

সোনালি সম্ভাবনার পথে বরকলের হলুদ, সার সংকটে শঙ্কায় হাজারো জুম চাষি

নিলাময় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, কৃষকদের সার পরিবহনে হয়রানির বিষয়টি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় উত্থাপন করা হয়েছে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, “বরকলে হলুদ চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ, উন্নত প্রযুক্তি এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এ উপজেলায় রেকর্ড পরিমাণ হলুদ উৎপাদন সম্ভব।”

আইমাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুবিলমল চাকমা বলেন, প্রকৃত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে সহজ প্রক্রিয়ায় সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, কৃষি অধিদপ্তরের মাধ্যমে ডিজিটাল কৃষি কার্ড চালু করে নিবন্ধিত কৃষকদের সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা গেলে হয়রানি কমবে এবং উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, বরকলের পাহাড়ি মাটি, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং অনুকূল জলবায়ু উচ্চমানের হলুদ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানকার হলুদের রং, ঘ্রাণ ও গুণগত মান দেশীয় বাজারে ইতোমধ্যেই সুনাম অর্জন করেছে। যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে রপ্তানিরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কৃষিঋণের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা চালু করাও জরুরি।

স্থানীয় সমাজসেবক জ্ঞান চাকমা বলেন, সরকারি সহায়তা, কৃষি প্রশিক্ষণ, সহজে সার সরবরাহ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বরকল শুধু রাঙামাটিই নয়, সারাদেশের অন্যতম প্রধান হলুদ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এতে হাজারো জুম চাষির জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।

বরকলের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল ইতোমধ্যেই হলুদ চাষের সম্ভাবনাময় জনপদ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। প্রতি সপ্তাহেই এখান থেকে বিপুল পরিমাণ হলুদ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, সময়োপযোগী সরকারি উদ্যোগ, সার সরবরাহে বাস্তবসম্মত নীতিমালা, কৃষকদের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বরকল ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ হলুদ উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

কৃষকদের প্রত্যাশা, উৎপাদনের মৌসুমে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা দূর করে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা হলে এই পাহাড়ি জনপদের কৃষি অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং দেশের মসলা উৎপাদনেও বরকল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *