মাটিরাঙ্গায় বিজিবির অভিযানে দুই বিদেশি পিস্তল, গুলি ও ৫ কোটি টাকার ক্রিস্টাল মেথ উদ্ধার
![]()
ক্রিস্টাল মেথ-আইস জব্দের ঘটনা এবারই প্রথম
জার্নাল প্রতিবেদক
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মাটিরাঙ্গায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)–এর বিশেষ অভিযানে দুটি বিদেশি পিস্তল, ১০ রাউন্ড গুলি এবং বিপুল পরিমাণ ক্রিস্টাল মেথ-আইস উদ্ধার করা হয়েছে। বিজিবির দাবি, উদ্ধার হওয়া আইসের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। খাগড়াছড়ির মত পাহাড়ি এলাকায় এত বড় পরিমাণ ক্রিস্টাল মেথ-আইস জব্দের ঘটনা এবারই প্রথম বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ভোররাতে মাটিরাঙ্গার যামিনীপাড়া এলাকায় বিজিবির যামিনীপাড়া ব্যাটালিয়ন (২৩ বিজিবি) এ অভিযান পরিচালনা করে।
বিজিবি সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যামিনীপাড়া ব্যাটালিয়ন অধিনায়কের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টহল দল গৌরাঙ্গপাড়া তিন রাস্তার মোড়ে অস্থায়ী মোবাইল চেকপোস্ট বসায়। রাত আনুমানিক ২টা ৪০ মিনিটের দিকে পানছড়ির দিক থেকে আসা একটি মোটরসাইকেল চেকপোস্টের সামনে এলে সেটিকে থামার সংকেত দেওয়া হয়।
তবে মোটরসাইকেলটিতে থাকা দুই আরোহী থামার ভান করে গতি কমিয়ে হঠাৎ মোটরসাইকেলটি ঘুরিয়ে তাইন্দংয়ের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে বিজিবির টহল দল তাৎক্ষণিকভাবে মোটরসাইকেলটির পিছু নেয়।
প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার ধাওয়া করার পর মোটরসাইকেলটি মূল সড়ক ছেড়ে বিরাশিটিলার একটি সরু সড়কে ঢুকে পড়ে। এ সময় বৃষ্টি, কাদা, অন্ধকার ও দুর্গম সড়কের সুযোগ নিয়ে দুই আরোহী রাস্তার পাশে একটি কালভার্টের নিচে মোটরসাইকেলটি ফেলে পাহাড়ি জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায়।
পরে বিজিবি সদস্যরা পরিত্যক্ত মোটরসাইকেলটিতে তল্লাশি চালিয়ে সিটের নিচে বিশেষভাবে লুকানো অবস্থায় একটি ম্যাগাজিনসহ দুটি বিদেশি পিস্তল, ১০ রাউন্ড গুলি এবং বিপুল পরিমাণ ক্রিস্টাল মেথ-আইস উদ্ধার করেন।
খাগড়াছড়িতে প্রথমবার, উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ‘আইস’
জেলার ইতিহাসে যামিনীপাড়া এলাকায় এটি প্রথম ক্রিস্টাল মেথ-আইস জব্দের ঘটনা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকায় মাদকটির এত বড় চালান আটকের ঘটনাও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’ অত্যন্ত শক্তিশালী ও উচ্চমাত্রায় আসক্তি সৃষ্টিকারী একটি মাদক। সাধারণ ইয়াবার তুলনায় এতে মেথামফেটামিনের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় এর প্রভাবও তীব্র। এটি গ্রহণের ফলে অস্বাভাবিক উত্তেজনা, অনিদ্রা, উদ্বেগ, আচরণগত পরিবর্তন ও মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যবহারে হৃদ্যন্ত্র ও মস্তিষ্কের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি গুরুতর আসক্তি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে এ ধরনের মাদকের বিস্তার শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে না; এর সঙ্গে পারিবারিক অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণতা, সহিংসতা ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়ও জড়িয়ে পড়ে। ফলে পাহাড়ি এলাকায় ক্রিস্টাল মেথের বড় চালান আটকের ঘটনা মাদক পাচারের নতুন প্রবণতার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনছে।

মাদকের সঙ্গে অস্ত্র, বাড়ছে ঝুঁকি
এ ঘটনায় উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো—মাদক চালানের সঙ্গে একইসঙ্গে দুটি বিদেশি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার হয়েছে। অর্থাৎ শুধু মাদক পরিবহন নয়, অস্ত্র বহনের ঘটনাও একই চালানের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
সীমান্তবর্তী ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকাকে ব্যবহার করে মাদক ও অস্ত্র পরিবহনের চেষ্টা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মাদক ব্যবসার অর্থের সঙ্গে অবৈধ অস্ত্রের যোগসূত্র তৈরি হলে অপরাধী চক্রগুলোর সক্ষমতা ও সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এ কারণে মাটিরাঙ্গায় একই অভিযানে বিপুল মূল্যের আইসের পাশাপাশি বিদেশি পিস্তল ও গুলি উদ্ধারের ঘটনাকে শুধু একটি মাদকবিরোধী অভিযান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সীমান্তপথ ব্যবহার করে মাদক ও অস্ত্রের সম্ভাব্য আন্তঃসংযোগ এবং এর পেছনে থাকা চক্র শনাক্ত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পালিয়ে যাওয়া দুইজনকে শনাক্তের চেষ্টা
বিজিবি সূত্র জানায়, চেকপোস্টে থামার সংকেত অমান্য করে পালিয়ে যাওয়া দুই ব্যক্তিই মোটরসাইকেলটি ফেলে পাহাড়ি জঙ্গলে পালিয়ে যায়। তাদের আটক করা সম্ভব না হলেও ফেলে যাওয়া মোটরসাইকেল ও উদ্ধার করা অস্ত্র-মাদক থেকে চক্রটির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল, অস্ত্র, গুলি ও মাদক যথাযথ প্রক্রিয়ায় জব্দ করা হয়েছে। পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আটকের পাশাপাশি এই চালানের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
যামিনীপাড়া ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. খালিদ ইবনে হোসেন বলেন, উদ্ধার হওয়া ক্রিস্টাল মেথ-আইসের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র ও মাদক পাচার প্রতিরোধে বিজিবির এ ধরনের বিশেষ ও কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে।
খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকায় প্রথমবারের মতো বিপুল পরিমাণ ক্রিস্টাল মেথ-আইস উদ্ধারের এ ঘটনা মাদক পাচারের নতুন রুট ও নেটওয়ার্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে মাদকের সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার এবং পাচারচক্রের মূলহোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।