আসামে ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি নিয়ে আলোচনা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঘটনাকে স্মরণ করে ভারতের আসামে ১৭ আগস্টকে ‘চাকমা কালো দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়েছে। সোমবার আসামের গুয়াহাটির পূর্ত বিভাগের অডিটোরিয়ামে ‘India’s Partition: Black Day for Chakma People’ শীর্ষক জনসভায় চাকমা জনগোষ্ঠী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা এ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
‘জনগণ টিভি’ ও ‘ইন্টেলেকচুয়াল ফোরাম ফর নর্থইস্ট’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি, গবেষক, বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের নেতা, শিক্ষার্থী, বুদ্ধিজীবী, লেখক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট র্যাডক্লিফ বাউন্ডারি কমিশনের সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত প্রকাশের বিষয়টি স্মরণ করেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, ওই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তৎকালীন অমুসলিম ও বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। তাদের মতে, দেশভাগের সেই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজনীতি, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, ভূমি সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বিদ্যমান।
বক্তারা ১৯৪৭ সালের ঘটনাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের আলোচনায় দেশভাগ-পরবর্তী বাস্তুচ্যুতি, ভূমি ও পরিচয়সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন এবং এসবের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও ভূমিসংক্রান্ত সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
তাদের মতে, দীর্ঘ সশস্ত্র সংঘাতের অবসানে চুক্তিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগ ছিল। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পর এর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে ঘাটতি রয়েছে, তা দূর করা প্রয়োজন।
বক্তারা চুক্তির বিভিন্ন ধারা কার্যকর বাস্তবায়ন এবং চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের ভাষ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চুক্তির বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানের আলোচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্বও বিশেষভাবে উঠে আসে। বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামের কাছাকাছি এবং বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরসহ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামোর সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে। বক্তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে বঙ্গোপসাগর, চট্টগ্রাম, উত্তর-পূর্ব ভারত, মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার সম্ভাব্য সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরেন।
এ সময় উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচিত হয়। বক্তারা উল্লেখ করেন, ভারতীয় পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৯ সালে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) চালুর ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য বিকল্প লজিস্টিক রুটের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আসাম প্রদেশের শিক্ষা ও উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রী রণজ পেগু। বিশেষ অতিথি ছিলেন আসামের হ্যান্ডলুম, টেক্সটাইল ও সেরিকালচার বিষয়ক মন্ত্রী বিশ্বজিৎ দাইমারি।
বিকেলের অধিবেশনে বক্তব্য দেন অল আসাম চাকমা সোসাইটির সভাপতি আশুতোষ চাকমা, আসাম যুব কমিশনের সদস্য মিতা নাথ বোরা, গবেষক ড. অঙ্কিতা দত্ত, লেখক ও কলামিস্ট দৃষ্টি মুনি চাকমা এবং অল ইন্ডিয়া চাকমা স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি।
আলোচনায় বক্তারা চাকমা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও পরিচয় সংরক্ষণ, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি নিয়ে গবেষণা এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
তবে অনুষ্ঠানে উত্থাপিত পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, জনসংখ্যাগত পরিস্থিতি ও ১৯৪৭ সালের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য মূলত আয়োজক ও বক্তাদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে উপস্থাপিত হয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।