দিল্লিতে ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ

দিল্লিতে ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ

দিল্লিতে ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ভারতের নয়াদিল্লিতে ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন করেছেন দিল্লি-এনসিআর এলাকায় বসবাসরত চাকমা সম্প্রদায়ের সদস্যরা।

সোমবার (১৭ আগস্ট) নয়াদিল্লির ভগবান বিরসা মুন্ডা ভবনে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বক্তারা ১৯৪৭ সালের সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে চাকমা জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা ও অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা করেছিল।

বক্তারা দাবি করেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি ছিল, তাতে ওই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নিজেদের ভবিষ্যৎ ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হবে বলে প্রত্যাশা করেছিল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে র‌্যাডক্লিফ বাউন্ডারি কমিশনের সিদ্ধান্তে পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেই প্রত্যাশার অবসান ঘটে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট রাঙামাটিতে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনাটি স্মরণ করেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৪-১৫ আগস্টের মধ্যরাতে প্রায় ১০ হাজার চাকমা রাঙামাটিতে তৎকালীন ব্রিটিশ ডেপুটি কমিশনার কর্নেল জি. এল. হাইডের বাসভবনের সামনে জড়ো হন।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভারতের স্বাধীনতা উদযাপন ও ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন। পরে ১৫ আগস্ট সকালে রাঙামাটির একটি ফুটবল মাঠে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে ভারতের পতাকা উত্তোলন করা হয় বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।

তাদের দাবি, সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের একটি অংশ মনে করেছিলেন, অঞ্চলটি স্বাধীন ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

কিন্তু ১৭ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ বাউন্ডারি কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। বক্তারা বলেন, ওই সিদ্ধান্তে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের পরিবর্তে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সিদ্ধান্ত প্রকাশের পরও রাঙামাটিতে কয়েক দিন ভারতের জাতীয় পতাকা উড়তে থাকে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২১ আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনী রাঙামাটিতে গিয়ে ভারতের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে।

এ সময় বক্তারা তৎকালীন ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাদের দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিতে ভারতের পক্ষ থেকে সামরিক বা রাজনৈতিক সমর্থন না পাওয়ায় চাকমাদের প্রতিরোধের উদ্যোগ সফল হয়নি।

তবে এসব বক্তব্য অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বক্তাদের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ও দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে।

চাকমা কালো দিবস পালন কমিটির আহ্বায়ক পরিতোষ চাকমা বলেন, ২০১৬ সালে চাকমা ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (CNCI) প্রতিবছর ১৭ আগস্ট ‘চাকমা কালো দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

তিনি বলেন, চাকমাদের মধ্যে দিনটি ‘পোরা হোবাল্যে দিন’ নামেও পরিচিত, যার অর্থ ‘পোড়া কপালের দিন’। তাঁর ভাষ্য, ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্টের সিদ্ধান্তকে চাকমা সম্প্রদায়ের ভবিষ্যতের ওপর গভীর প্রভাব ফেলা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।

পরিতোষ চাকমার ভাষায়, “চাকমারা মনে করেন, ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট তাদের ভবিষ্যৎ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।”

দিল্লি চাকমা স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি বিপুল চাকমা বলেন, দেশভাগের আগে চাকমারা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামেই নয়, আসাম, মিজোরাম ও ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন এলাকাতেও বসবাস করত।

তিনি বলেন, র‌্যাডক্লিফ সীমারেখা একই জনগোষ্ঠীর মানুষকে পৃথক রাষ্ট্রের মধ্যে বিভক্ত করে দেয়। তাঁর মতে, এটি চাকমা জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায়।

বক্তারা বলেন, দেশভাগের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত চাকমা জনগোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় রয়েছে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা শুধু ১৯৪৭ সালের ইতিহাস স্মরণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত চাকমা জনগোষ্ঠীর বর্তমান বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও আলোচনা করেন।

তারা চাকমা জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচয় সংরক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষা, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

বক্তারা চাকমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য জোরদারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিজেদের ইতিহাস ও পরিচয় সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে আরও সচেতন করে তুলতে হবে।

নয়াদিল্লির পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন এলাকাতেও ১৭ আগস্ট ‘চাকমা কালো দিবস’ পালন করা হয়। মিজোরামের চাকমা অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (CADC) ও আইজল, আসামের গুয়াহাটি এবং ত্রিপুরার বিভিন্ন এলাকায় চাকমা সংগঠন ও সম্প্রদায়ের সদস্যরা এ উপলক্ষে কর্মসূচি আয়োজন করেন।

এ ছাড়া ‘চাঙমা র (Changmah Raw)’ সংবাদ চ্যানেলের উদ্যোগে অনলাইন টক শোর আয়োজন করা হয়। এতে ভারতীয় চাকমা সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অনলাইন আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন চাকমা অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের (CADC) চিফ এক্সিকিউটিভ মেম্বার নিরুপম চাকমা, মিজোরামের বিধানসভা সদস্য প্রভা চাকমা ও রসিক মোহন চাকমা, ত্রিপুরার বিধানসভা সদস্য শম্ভুলাল চাকমা, ত্রিপুরার চাকমা সমাজের নেতা শান্তি বিকাশ চাকমা, লেখক ও সমাজকর্মী পরিতোষ চাকমা এবং গুয়াহাটির স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার জেনারেল ম্যানেজার আশুতোষ চাকমা।

আলোচনায় বক্তারা ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা নির্ধারণকে ঘিরে চাকমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক বঞ্চনার দাবি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত চাকমাদের বর্তমান সমস্যা মোকাবিলায় নিজেদের মধ্যে ঐক্য জোরদার এবং শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে অধিকার ও স্বার্থের বিষয়গুলো তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed