ত্রাণের আশায় রোহিঙ্গা ডেটাবেজে নাম দিয়ে নাগরিক পরিচয় সংকটে বহু বাংলাদেশি
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
ভিটেমাটি ও জীবিকা হারিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে ত্রাণের আশায় রোহিঙ্গা ডেটাবেসে নাম তুলেছিলেন উখিয়া-টেকনাফের অনেক স্থানীয় বাঙালি। সেই সিদ্ধান্তই এখন তাদের নাগরিক পরিচয়ের সংকট তৈরি করেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট কিংবা জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়ছেন তারা। প্রশ্ন উঠছে, অভাবের তাড়নায় নেয়া একটি সিদ্ধান্ত কি কেড়ে নিতে পারে নাগরিক অধিকার? প্রশাসন বলছে, যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত বাংলাদেশিদের রোহিঙ্গা ডেটাবেস থেকে বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে তালিকায় থাকা স্থানীয় বাংলাদেশির সঠিক সংখ্যা এখনও জানা যায়নি।
উখিয়ার কুতুপালংয়ের লম্বাশিয়া গ্রামের বাসিন্দা আয়েশা বেগম। ২০১৭ সালের আগে নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করেই চলত তার সংসার। রোহিঙ্গাদের আগমনের পর জমি হারিয়ে কমে যায় কৃষিকাজ। বন্ধ হয়ে যায় হাঁস-মুরগি পালনও। জীবিকার সংকটে অনাহারে দিন কাটতে থাকায় শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাঙালি পরিচয় গোপন করে রোহিঙ্গা ডেটাবেসে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি।
আয়েশা বেগম বলেন, রোহিঙ্গারা আসার পর থেকেই স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নানা কষ্ট ও দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে। অনেক সময় অনাহারে-অর্ধাহারেও থাকতে হয়েছে। আগে নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করে ফসল ও সবজি উৎপাদন করতেন। তা দিয়ে পরিবারের খাদ্যের চাহিদা মেটানো হতো। কিন্তু রোহিঙ্গারা আসার পর তাদের অনেক জমি ছেড়ে দিতে হয়েছে। ফলে আগের মতো চাষাবাদ করা যাচ্ছে না। অনেক জায়গা দখল হয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজের পাশাপাশি হাঁস-মুরগিও পালন করা সম্ভব হচ্ছে না।
আয়েশা খাতুন আরও বলেন, জায়গা ও জীবিকার সংকটে দিনের পর দিন অনাহারে থাকতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ক্ষুধার তাড়না ও অসহায়ত্বের কারণে বাধ্য হয়ে রোহিঙ্গাদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি রোহিঙ্গা তালিকায় নিবন্ধিত হন।
একই সংকটে পড়েন কুলছুমা খাতুনও। সংসারে অভাব, বসতভিটায় জায়গার সংকট আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় জীবিকার পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তিনিও রোহিঙ্গা ডেটাবেসে নাম অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হন।
কুলছুমা খাতুন বলেন, ঠিকমতো খেতে না পারা এবং অভাব-অনটনের কারণে বাধ্য হয়েই রোহিঙ্গা কার্ড করেছিলাম। বিয়ে দেয়া হলেও শ্বশুরবাড়িতে থাকার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। সংসারে অভাব থাকায় ছেলে-মেয়েদেরও অনেক কষ্ট হচ্ছে। তাদের কষ্ট দেখেই শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা কার্ড করতে বাধ্য হয়েছি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্যাম্পের আশপাশে কাঁটাতারের বেড়ার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগে থাকলেও তাদের সংকট সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বরং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক স্থানীয়ের জীবনযাপন এখন রোহিঙ্গাদের চেয়েও দুর্বিষহ।
কুতুপালংয়ের স্থানীয় বাসিন্দা সুফিয়া খাতুন বলেন, রোহিঙ্গারা আসার পর তাদের বসতি স্থাপনের জন্য বাড়িভিটাসহ আশপাশের অনেক জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে। তারা নিজেরাও দরিদ্র। রোহিঙ্গারা যেসব সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছিলেন, সেগুলো পাওয়ার আশায় এবং চরম অভাবের কারণে বাধ্য হয়ে তারাও রোহিঙ্গা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর রোহিঙ্গাদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়ায় আগের মতো চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। ক্ষেত-খামারও করা যাচ্ছে না। ফলে আর্থিক অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা রোহিঙ্গাদের চেয়েও দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। ক্ষুধা ও অভাবের তাড়নায় শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা কার্ড করতে বাধ্য হয়েছেন।
সুফিয়া খাতুন আরও বলেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের সময়ই স্থানীয়দের সতর্ক করা উচিত ছিল, যাতে তারা রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ সুযোগ-সুবিধা নিজেদের নামে নেয়ার চেষ্টা না করেন। পাশাপাশি যারা এভাবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন, তাদের শনাক্ত করে আলাদা ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগও প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সান্ত্বনা বা যথাযথ সতর্কতা পাইনি।
লম্বাশিয়া গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা মো. মফিজ বলেন, এলাকার কিছু অসহায় মানুষ, বিশেষ করে বয়স্ক ও স্বামীহীন নারীরা বিভিন্ন কারণে রোহিঙ্গা কার্ড করেছেন। এলাকায় রোহিঙ্গা কার্ডধারীদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই স্থানীয় বাসিন্দা, যারা একসময় নানা পরিস্থিতিতে নিজেদের নাম রোহিঙ্গা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
এদিকে রোহিঙ্গা ডেটাবেসে স্থানীয় বাঙালিদের তথ্য থাকায় এনআইডি, পাসপোর্ট ও জন্মনিবন্ধনসহ সরকারি সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেক বাংলাদেশি নাগরিক। এমন দাবি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের।
রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর ও উদ্বেগজনক। বিশেষ করে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার শুরুর দিকে ত্রাণ ও সহযোগিতা পাওয়ার আশায় অনেক স্থানীয় বাঙালি রোহিঙ্গাদের তথ্যের সঙ্গে নিজেদের নামও অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। বর্তমানে সেই তথ্যের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডার এবং নির্বাচন কমিশনের সার্ভার পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় অনেক বাংলাদেশি নাগরিক পাসপোর্ট, এনআইডি কিংবা জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। রোহিঙ্গা ডেটাবেসে তথ্য থাকায় পরিচয় যাচাইয়ের সময় নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, তার এলাকায় এরই মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি পরিবার পাওয়া গেছে, যাদের সদস্যদের আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক তথ্য ওই ডেটাবেসে রয়েছে। ফলে তারা বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ছেন। সমস্যা সমাধানে অনেকে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে গিয়ে নিজেদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তথ্য বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় সহজে সমাধান হচ্ছে না।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের দাবি, ত্রাণের আশায় কিছু স্থানীয় দরিদ্র মানুষ রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তের মাধ্যমে তথ্য সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ইউএনএইচসিআরও বলছে, নিবন্ধন একটি চলমান প্রক্রিয়া। যাচাইয়ে বাংলাদেশি নাগরিক শনাক্ত হলে তাদের ডেটাবেস থেকে বাদ দেয়া হয়।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার সময় তাদের নিবন্ধনের জন্য ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের পক্ষ থেকে প্রায় ৫০টি বুথ স্থাপন করা হয়েছিল। নিবন্ধনের পর রোহিঙ্গাদের একটি করে রেজিস্ট্রেশন কার্ড দেয়া হতো। ওই কার্ডের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন ধরনের ত্রাণ ও সহায়তা পেতেন।
তিনি বলেন, ওই সময় ত্রাণ পাওয়ার আশায় স্থানীয় কিছু দরিদ্র মানুষও রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে থাকতে পারেন। এ ধরনের কোনো ঘটনা নিয়ে আবেদন এলে তা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে জেলা প্রশাসন স্থানীয়ভাবে ইউএনও ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন কমিশনে এলে তা ইউএনএইচসিআরের কাছে পাঠানো হয়, যাতে প্রয়োজনীয় ডেটা সংশোধন করা যায়।
মো. মিজানুর রহমান জানান, সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের কিছু তথ্য সংশোধন করা সম্ভব হয়েছে এবং সংশোধনের জন্য সেগুলো ইউএনএইচসিআরের কাছে পাঠানো হয়েছে। আরও কিছু আবেদন বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। এভাবে কতজন স্থানীয় নাগরিক রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন, তা সঠিকভাবে বলা কঠিন। বিষয়টি অনেকটা গোপন থাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সাধারণত তা স্বীকার করেন না। তারা যখন এনআইডি বা পাসপোর্ট করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন, তখনই বিষয়টি নিয়ে আবেদন করেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় ডেটাবেস, ইউএনএইচসিআরের ডেটাবেস এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ ডেটাবেসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় বা সিনক্রোনাইজেশন না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃতপক্ষে কতজন বাংলাদেশি নাগরিক রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন, তা নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা কঠিন।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
ইউএনএইচসিআরের ডেটা, পরিচয় ব্যবস্থাপনা ও বিশ্লেষণ সমন্বয়ক জিয়ানলুকা ওগিস বলেন, ২০১৭ সালে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। বাংলাদেশ সরকার জরুরি ভিত্তিতে বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের ব্যবস্থা করে এবং তাদের সঙ্গে থাকা কাগজপত্রের সঙ্গে বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাই করা হয়। ওই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে কিছু অসহায় বাংলাদেশি নাগরিক সহায়তা পাওয়ার জন্য রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধনের চেষ্টা করেন এবং কেউ কেউ নিবন্ধিতও হতে পেরেছিলেন। প্রাথমিক নিবন্ধনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআরের মধ্যে যৌথ যাচাই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর মাধ্যমে ডেটাবেস আরও যাচাই ও সংশোধন করা হয়।
বর্তমানে ওই তথ্যই মানবিক সাড়ার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে জানিয়ে জিয়ানলুকা ওগিস আরও বলেন, নিবন্ধন একটি চলমান প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে তথ্য যাচাই ও হালনাগাদ করা হয়। মূলত এটি ক্যাম্পে থাকা ১২ লাখ মানুষের একটি চলমান নিবন্ধন তালিকা। সেখানে নতুন জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে ও বিচ্ছেদের তথ্য নিয়মিত যুক্ত হয়। ফলে তথ্যগুলো নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় এবং বিভিন্ন সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়।
এসব কার্যক্রমের সময় কোনো বাংলাদেশি নাগরিক শনাক্ত হলে তাদের বিস্তারিত সাক্ষাৎকারের জন্য ইউএনএইচসিআরের কাছে পাঠানো হয়। যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি সত্য প্রমাণিত হলে তাদের রোহিঙ্গা শরণার্থী ডেটাবেস থেকে বাদ দেয়া হয়।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ডেটাবেস থেকে নিজের নাম বাদ দিতে আবেদন করেছেন ২০২ জন বাংলাদেশি।
-সময় সংবাদ।