হারিয়ে যেতে বসা ভাষা-সংস্কৃতি সংরক্ষণে সেনাবাহিনীর উদ্যোগ, ফটিকছড়িতে দিনব্যাপী কর্মশালা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
বিলুপ্তপ্রায় ও হারিয়ে যেতে বসা ভাষা সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে দিনব্যাপী ‘ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা-২০২৬’ শীর্ষক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) ফটিকছড়ির বাইন্যাছোলা-মানিকপুর উচ্চবিদ্যালয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লক্ষ্মীছড়ি জোনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আয়োজনে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালায় চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, বর্ণমালা, শব্দভান্ডার, উচ্চারণ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক বিভিন্ন বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়।
আয়োজকদের মতে, সময়ের পরিবর্তন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে দেশের অনেক স্থানীয় ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ধীরে ধীরে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। এসব ভাষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, জীবনধারা, লোকজ জ্ঞান, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ফলে একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যমের বিলুপ্তি নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও জ্ঞানভান্ডারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ বাস্তবতায় দুর্গম ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সামনে ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব তুলে ধরতে সেনাবাহিনীর এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কর্মশালায় শুধু ভাষা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়নি, বরং নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক চর্চার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আয়োজকেরা জানান, স্থানীয় ভাষাগুলোর বর্ণমালা, শব্দভান্ডার, উচ্চারণ ও ব্যবহার লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক তথ্য-উপাত্ত, লেখা ও উপকরণ সংগ্রহ করে ভবিষ্যতে গ্রন্থাকারে সংরক্ষণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।
কর্মশালায় লক্ষ্মীছড়ি জোন অধিনায়ক লে. কর্নেল খাঁন সজিবুল ইসলাম বলেন, “ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ধারক।”
তিনি বলেন, কোনো ভাষা হারিয়ে গেলে ওই ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোকজ জ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। তাই বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোকে শুধু বইয়ের পাতায় সংরক্ষণ করলেই হবে না; নতুন প্রজন্মের মধ্যে এসব ভাষার চর্চা ও ব্যবহারের আগ্রহও তৈরি করতে হবে।
সেনা জোনের এ উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ দেখা যায়। কর্মশালায় ভাষা শেখা, নিজস্ব বর্ণমালা ও শব্দের ব্যবহার, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়ার সুযোগ পায়।
বিশেষ করে পাহাড় ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে শিক্ষা, জনকল্যাণ ও সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে এমন কার্যক্রমকে ব্যতিক্রমী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় সেনাবাহিনীর এ ধরনের সম্পৃক্ততা পারস্পরিক আস্থা ও সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় করতে ভূমিকা রাখবে।
কর্মশালায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ববোধ এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে নতুন প্রজন্ম। সেই প্রজন্মকে সামনে রেখে বিদ্যালয় পর্যায়ে ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার এমন উদ্যোগ ভবিষ্যতে বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আর দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তাকেও আরও শক্তিশালী করছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।