দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে সেনাবাহিনী, চালু হচ্ছে বন্ধ দুই বিদ্যালয়

দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে সেনাবাহিনী, চালু হচ্ছে বন্ধ দুই বিদ্যালয়

দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে সেনাবাহিনী, চালু হচ্ছে বন্ধ দুই বিদ্যালয়
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, সুপেয় পানির সংকট নিরসন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন মেটাতে মানবিক সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। জেলার রুমা উপজেলার সুংসুংপাড়া সাব-জোনের আওতাধীন বিভিন্ন পাড়ায় শিক্ষা উপকরণ, বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ার এবং সুপেয় পানি সরবরাহের উপকরণ বিতরণ করেছে সেনাবাহিনী।

সোমবার (৩১ আগস্ট) সুংসুংপাড়া আর্মি ক্যাম্পে ১৬ ইস্ট বেঙ্গলের উদ্যোগে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আয়োজিত মানবিক এক অনুষ্ঠানে এসব সামগ্রী বিতরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ১৬ ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ আতিকুল করিম। এ সময় সুংসুংপাড়া সাব-জোনের আওতাধীন বিভিন্ন পাড়ার কারবারি, গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।

বন্ধ বিদ্যালয় চালুর উদ্যোগ

দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর এ উদ্যোগে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে জারুলছড়ি পাড়া স্কুল ও আরিফপাড়া স্কুল।

অনুষ্ঠানে জারুলছড়ি পাড়া স্কুলের জন্য একটি সোলার প্যানেল, একটি সোলার ব্যাটারি, আট জোড়া বেঞ্চ, দুই সেট চেয়ার-টেবিল ও একটি আলমারি দেওয়া হয়। একইভাবে আরিফপাড়া স্কুলের জন্য সাত জোড়া বেঞ্চ, দুই সেট চেয়ার-টেবিল ও একটি আলমারি প্রদান করা হয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্গম অবস্থান, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের অভাব এবং শিক্ষক সংকটের কারণে বিদ্যালয় দুটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল। ফলে এসব এলাকার কোমলমতি শিশুদের শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল।

শিশুদের শিক্ষার সুযোগ ফিরিয়ে আনতে গত জুলাই মাসে ১৬ ইস্ট বেঙ্গলের উদ্যোগে বিদ্যালয় দুটিতে স্টেশনারি ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হয়। একই সময় থেকে বিদ্যালয় দুটির একজন করে শিক্ষকের বেতনের ব্যয়ও বহন করে আসছে সেনাবাহিনীর ইউনিটটি।

এবার বিদ্যালয় দুটিতে বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল, আলমারি এবং সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম দেওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর পথ আরও সুগম হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন পর দুর্গম এলাকার শিশুদের বিদ্যালয়মুখী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

জারুলছড়ি পাড়ার এক অভিভাবক বলেন, দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র না থাকায় শিক্ষাকার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আসবাবপত্র দেওয়ায় এখন বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নত হবে এবং শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ পাবে বলে আশা করছেন তাঁরা।

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরতি ত্রিপুরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “আমরা অনেক খুশি। বই, খাতা, কলমসহ অনেক কিছু পেয়েছি। আমরা অনেক আনন্দিত এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে অনেক ধন্যবাদ জানাই।”

সুপেয় পানির সংকটেও সহায়তা

শিক্ষার পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি পাড়াগুলোতে সুপেয় পানির সংকট নিরসনেও উদ্যোগ নিয়েছে সেনাবাহিনী।

লুনথাওসি পাড়া, থাইক্ষ্যং পাড়া, ক্লানচাদ পাড়া, খুমি পাড়া ও ক্র্যাসপাই পাড়ায় সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য মোট ৫ হাজার ৫০০ ফুট পানির পাইপ বিতরণ করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকার অনেক বাসিন্দাকে দূরবর্তী উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো। এতে বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তিতে পড়তে হতো।

খুমি পাড়ার বাসিন্দা এনং খুমি বলেন, “দীর্ঘদিন আমরা সুপেয় পানির অভাবে ছিলাম। অনেক দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগে আমাদের কষ্ট অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। আন্তরিকভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানাই।”

স্থানীয়দের মতে, পানির পাইপ সরবরাহের ফলে পাহাড়ি পাড়াগুলোতে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় দীর্ঘদিনের একটি বড় দুর্ভোগ কমবে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও সহায়তা

স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে সেনাবাহিনী। পুরাতন রোমানা পাড়া, ধোপানীছড়া পাড়া ও পাসিং পাড়ার গির্জার জন্য ৫০টি করে চেয়ার প্রদান করা হয়।

এ ছাড়া সুংসুংপাড়া গির্জার জন্য রিসোর্টের আয় থেকে ১০০টি চেয়ার ক্রয় করে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব সহায়তায় দুর্গম এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের সুবিধা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উন্নয়নের পাশাপাশি সম্প্রীতি সুদৃঢ় করার উদ্যোগ

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকাগুলোতে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা বড় চ্যালেঞ্জ। এমন বাস্তবতায় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানি ও সামাজিক অবকাঠামোর মতো মৌলিক প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত এসব কার্যক্রম স্থানীয় জনগণের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে সহায়তা করলে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। দুর্গম পাহাড়ি জনপদে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি, বন্ধ বিদ্যালয় চালুর উদ্যোগ এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা তৈরির মতো কার্যক্রম সেই আস্থাকে আরও শক্তিশালী করছে।

১৬ ইস্ট বেঙ্গলের লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ আতিকুল করিম বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সার্বিকভাবে আর্থিক সহযোগিতা ও শিক্ষা সামগ্রীর মাধ্যমে তাদের পাশে থেকে কাজ করে আসছে।”

তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কল্যাণ এবং ইতিবাচক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।

স্থানীয়দের মতে, দুর্গম পাহাড়ের যেসব এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি সেবার সুযোগ সীমিত, সেখানে সেনাবাহিনীর এমন উদ্যোগ শুধু তাৎক্ষণিক প্রয়োজনই পূরণ করছে না; বরং শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, পরিবারের জীবনমান উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আত্মবিশ্বাস বাড়াতেও ভূমিকা রাখছে।

সোমবারের এই আয়োজন তাই শুধু সহায়তা বিতরণের একটি কর্মসূচি নয়, দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষা, মানবিকতা ও উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থার বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *