রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ে মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা, সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করছে সেনাবাহিনী
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও আস্থার বন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এরই ধারাবাহিকতায় রাঙামাটিতে দিনব্যাপী বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করা হয়েছে।
রোববার সেনাবাহিনীর রাঙামাটি সদর জোনের ব্যবস্থাপনায় সাপছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় প্রাঙ্গণে এ মেডিকেল ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়। এতে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার শত শত অসহায়, দুস্থ নারী, পুরুষ ও শিশু বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ পেয়েছেন।
চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন রাঙামাটি সদর জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল একরামুল রাহাত।
উদ্বোধনী বক্তব্যে জোন অধিনায়ক বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতির ধারা বজায় রাখার পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সেনাবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দুর্গম এলাকায় বসবাসের কারণে যেসব মানুষ চিকিৎসাসেবা গ্রহণে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন, তাদের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াই এ ধরনের উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, মানবিক ও জনকল্যাণমূলক এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পাশে থাকার পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলে পারস্পরিক আস্থা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিবেশ আরও শক্তিশালী হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

দুর্গমতায় চিকিৎসার সংকট, পাশে সেনাবাহিনী
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতায় অনেক প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং নারীদের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
এ বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে আয়োজিত সেনাবাহিনীর মেডিকেল ক্যাম্পগুলো সাধারণ মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের মাধ্যমে অনেক সাধারণ রোগের প্রাথমিক চিকিৎসাও নিশ্চিত হচ্ছে।
সাপছড়ির এ ক্যাম্পেইনেও চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হয়। ফলে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক মানুষকে দূরের চিকিৎসাকেন্দ্রে না গিয়েই প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়।

চিকিৎসার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে আস্থার পরিবেশ
স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু বিনামূল্যে চিকিৎসা বা ওষুধ বিতরণ নয়; এর মাধ্যমে দুর্গম এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সরাসরি যোগাযোগ ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়।
পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে একই স্থানে চিকিৎসাসেবা পাওয়ায় সামাজিক সম্প্রীতির বার্তাও ছড়িয়ে পড়ে। মানবিক সহযোগিতার এমন কার্যক্রম স্থানীয় জনগণের দৈনন্দিন সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, দুর্যোগকালে ত্রাণ ও উদ্ধার সহায়তা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার মতো কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
স্থানীয়দের সন্তোষ ও কৃতজ্ঞতা
বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের ভাষ্য, দূরবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হলে সময় ও অর্থ—দুইয়েরই প্রয়োজন হয়। স্থানীয় এলাকায় এমন মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করায় দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য চিকিৎসা নেওয়া সহজ হয়েছে।
স্থানীয়রা মনে করেন, নিয়মিতভাবে এ ধরনের চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালিত হলে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ আরও বাড়বে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় জনগণের যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতাও আরও বিস্তৃত হবে।

শান্তি-সম্প্রীতির সঙ্গে জনকল্যাণের সেতুবন্ধন
পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে নিরাপত্তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের সুযোগ যত বাড়বে, ততই সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিবেশ শক্তিশালী হবে।
সাপছড়ির মেডিকেল ক্যাম্প সেই বৃহত্তর জনকল্যাণমূলক প্রচেষ্টারই একটি অংশ। চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজনীয় একটি সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একই সঙ্গে মানবিক দায়িত্ব পালন এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আস্থা ও সম্প্রীতির সম্পর্ক জোরদারে ভূমিকা রাখছে।
অনুষ্ঠানে সাপছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রবীন চাকমা, ইউপি সদস্য রিটন বড়ুয়া, মাবিকছড়ি বাজার সমিতির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম সগির, সাপছড়ি যুবদলের সভাপতি আব্দুল বাছা, সমাজ কমিটির সদস্য মো. জাসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দুর্গম মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সেনাবাহিনীর এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে। তাদের মতে, প্রত্যন্ত মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার এ উদ্যোগ শুধু তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যগত সংকটই মোকাবিলা করছে না, বরং পাহাড়ে পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্প্রীতি ও আস্থার পরিবেশ তৈরিতেও কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।