দুর্গম জুরাছড়িতে নারী-শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সেনাবাহিনীর মানবিক উদ্যোগ
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পাহাড়ের দুর্গম জনপদে নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ‘সুস্থ মা, নিরাপদ শিশু’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সেনাবাহিনীর রাঙামাটি রিজিয়নের সার্বিক তত্ত্বাবধানে জুরাছড়ি জোনের উদ্যোগে শুরু হয়েছে দুই সপ্তাহব্যাপী স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও প্রাথমিক চিকিৎসাবিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।
প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদের নারীদের স্বাস্থ্য সচেতন করে তোলা এবং পরিবারের নারী ও শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতা বাড়ানোই এ প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য। এতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পাহাড়ি ও বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন নারী অংশগ্রহণ করছেন।
জুরাছড়ি জোনের মেডিকেল অফিসার ক্যাপ্টেন মো. নাজমুস সাকিব এবং জুরাছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার মো. মুনতাসির আলমের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণটি পরিচালিত হচ্ছে। আগামী ১৭ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এ কার্যক্রম।
প্রশিক্ষণে নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি, রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের প্রয়োজনীয় ধারণা ও ব্যবহারিক জ্ঞান দেওয়া হচ্ছে।
দুর্গম পাহাড়ে স্বাস্থ্যসেবার নতুন সম্ভাবনা
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতায় দুর্গম এলাকার অনেক মানুষ প্রয়োজনের সময় দ্রুত চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে পারেন না। দুর্গমতা, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে দূরত্বের কারণে বিশেষ করে নারী ও শিশুরা বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন।
এ বাস্তবতায় শুধু চিকিৎসা দেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় নারীদের স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন নারী নিজের পরিবারের পাশাপাশি আশপাশের মানুষকেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারেন।
ফলে এ ধরনের প্রশিক্ষণ একদিকে যেমন তাৎক্ষণিকভাবে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ায়, অন্যদিকে প্রত্যন্ত এলাকায় একটি স্থানীয় স্বাস্থ্যসচেতন জনগোষ্ঠী তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।
‘সুস্থ মা’ মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ
একটি পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা যদি স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন হন, তাহলে সন্তানদের পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা, রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক চিকিৎসার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সেনাবাহিনীর এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে তাই নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যকে একই সূত্রে যুক্ত করা হয়েছে। নারীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তোলার মাধ্যমে পরিবার পর্যায়েই স্বাস্থ্য সচেতনতার ভিত্তি শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় ছোটখাটো অসুস্থতা বা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক করণীয় সম্পর্কে ধারণা থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। এতে রোগীর অবস্থা জটিল হওয়ার ঝুঁকি কমানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হতে পারে।
পাহাড়ি-বাঙালি নারীদের একসঙ্গে প্রশিক্ষণ
এ কর্মসূচির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—পাহাড়ি ও বাঙালি সম্প্রদায়ের নারীরা একই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো একটি মানবিক ও প্রয়োজনীয় বিষয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নারীদের এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার ফলে সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ ধরনের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন ও কল্যাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কার্যক্রম পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হয়।
চিকিৎসার পাশাপাশি সচেতনতার ওপর গুরুত্ব
সেনাবাহিনীর এ উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো—এখানে শুধু রোগী চিকিৎসার পরিবর্তে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার সুফল তাৎক্ষণিক হলেও একজন নারীকে স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তুললে সেই জ্ঞান দীর্ঘদিন পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকে।
এ কারণে স্বাস্থ্যসচেতনতা, রোগ প্রতিরোধ এবং প্রাথমিক চিকিৎসার মতো বিষয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগকে টেকসই জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জনকল্যাণে সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক ভূমিকা
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় নিরাপত্তা ও দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণের কল্যাণে চিকিৎসা, শিক্ষা, দুর্যোগকালীন সহায়তা ও বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
জুরাছড়িতে নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ প্রশিক্ষণ সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ সেনাবাহিনীর জনসম্পৃক্ততামূলক কর্মকাণ্ডকে আরও অর্থবহ করে তুলছে।
বিশেষ করে নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করায় এর সুফল শুধু প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ৩০-৩৫ জন নারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তাদের পরিবার, সন্তান এবং আশপাশের মানুষের মধ্যেও স্বাস্থ্য সচেতনতা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সুস্থ সমাজ গঠনে কার্যকর বিনিয়োগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুস্থ ও সচেতন সমাজ গঠনের জন্য শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসক বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞানও বাড়াতে হয়। সেই বিবেচনায় জুরাছড়ির মতো দুর্গম উপজেলায় স্থানীয় নারীদের স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ কার্যকর সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রাঙামাটি রিজিয়নের সার্বিক তত্ত্বাবধানে জুরাছড়ি জোনের এ কার্যক্রম পাহাড়ি জনপদের নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরিতেও এ উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সুস্থ সমাজ গঠনে এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।