সবুজের বুক চিরে রক্তিম সৌন্দর্য, মাটিরাঙ্গার পাহাড়ি পথে ফুটেছে ‘প্যাগোডা ফুল’
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ। দুপাশে সবুজের সমারোহ। কোথাও পাহাড়ের ঢালে সারি সারি গাছপালা, কোথাও বাঁশঝাড়। মাঝেমধ্যে সবুজের আড়াল ভেদ করে উঁকি দেয় টিনের ছাউনি কিংবা বাঁশে তৈরি পাহাড়ি বাড়ি। প্রকৃতি আর মানুষের এমন নিবিড় সহাবস্থানে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়নের ওয়াছুর পাহাড়ি সড়ক যেন হয়ে উঠেছে জীবন্ত এক ছবির ক্যানভাস।
সকালের নরম আলো কিংবা বিকেলের মৃদু রোদে এ পথ ধরে হাঁটলে চোখে পড়ে পাহাড়ি জনপদের চেনা জীবন। রাস্তার পাশে ছোট ছোট টং দোকানে স্থানীয়দের চায়ের আড্ডা। কোথাও ছক্কা-গুটির খেলায় মেতে উঠেছেন কয়েকজন। আবার একটু খোলা জায়গা পেলেই দল বেঁধে ফুটবল খেলায় ব্যস্ত কিশোর-তরুণরা। ব্যস্ত নগরজীবন থেকে অনেক দূরে এই সরল দৃশ্যগুলোয় যেন ধরা পড়ে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা স্বাভাবিক জীবনের ছবি।
তবে এই চেনা দৃশ্যের মাঝেও পথিকের চোখ হঠাৎ আটকে যায় অন্যরকম এক সৌন্দর্যে। সবুজ পাতার ফাঁক গলে দেখা মেলে গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তিম ফুলের। উজ্জ্বল লাল রঙে পাহাড়ি সবুজের বুকজুড়ে যেন কেউ ছড়িয়ে দিয়েছে এক মুঠো আগুনরাঙা রং। স্থানীয়ভাবে ‘লালভান্ডি’ নামে পরিচিত ফুলটি ‘প্যাগোডা ফুল’ নামেও পরিচিত।

মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়নের ওয়াছুর বাসিন্দা তাহের মিয়ার বাড়ির সামনেই দেখা মিলেছে এমন একটি ফুলগাছের। একইভাবে ওয়াছুর রাম্রাচাইয়ের বাড়ির আঙিনাতেও রয়েছে লালভান্ডির গাছ। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ এলাকার আরও অনেক বাড়ির আঙিনায় দেখা যায় দৃষ্টিনন্দন এই ফুল। পাহাড়ি সবুজের মাঝে উজ্জ্বল লাল ফুলগুলো বাড়ির চারপাশের সৌন্দর্যও যেন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফুলটির বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrum paniculatum। ইংরেজিতে এটি Pagoda Flower নামে পরিচিত। ফুলগুলো স্তরে স্তরে গুচ্ছাকারে সাজানো থাকে বলে দূর থেকে এর পুষ্পমঞ্জরিকে অনেকটা প্যাগোডার মতো দেখায়। অসংখ্য ছোট লাল বা কমলা-লাল ফুল একসঙ্গে ফুটে তৈরি করে বড় ও আকর্ষণীয় পুষ্পমঞ্জরি। লম্বা ও সরু পুংকেশর ফুলের সৌন্দর্যে যোগ করে আলাদা মাত্রা।
প্রকৃতিতে এটি Clerodendrum গণের একটি শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ। উজ্জ্বল রঙের কারণে ফুলটি সহজেই নজর কাড়ে এবং বিভিন্ন পরাগায়নকারী পতঙ্গ, বিশেষ করে প্রজাপতিকে আকৃষ্ট করে। জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মাটি এবং আংশিক আলো-ছায়াযুক্ত পরিবেশে এ গাছ ভালো বেড়ে ওঠে।

ফুলটির বিশেষত্ব শুধু রঙে নয়, এর গঠনেও। ফুলগুলো একটির পর একটি স্তরে সাজানো হয়ে ওপরে উঠে গেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজ পাতার ভেতর লাল রঙের ছোট্ট কোনো স্থাপনা দাঁড়িয়ে আছে। আর সেখান থেকেই ‘প্যাগোডা ফুল’ নামটির যথার্থতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ওয়াছুর বাসিন্দা তাহের মিয়া বলেন, “বনে কাজ করতে গিয়ে ফুলটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে একটি গাছ বাড়িতে এনে লাগিয়েছিলাম। এখন সেই গাছে ফুল ফুটেছে। ফুল ফুটলে পুরো জায়গাটিই যেন অন্যরকম সুন্দর হয়ে ওঠে। দূর থেকেও ফুলটির সৌন্দর্য সহজেই চোখে পড়ে। পথ দিয়ে যাতায়াতের সময় অনেকেই এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। কেউ কেউ আবার স্মৃতি হিসেবে ফুলটির ছবি তুলে নিয়ে যান। বাড়ির সামনে এমন একটি সুন্দর ফুল ফুটতে দেখা সত্যিই আনন্দের।”
স্থানীয় বাসিন্দা রাম্রাচাই বলেন, “আত্মীয়ের বাড়িতে ফুলটি দেখে ভালো লাগায় একটি গাছ এনে বাড়িতে লাগিয়েছিলাম। এখন সেই গাছে ফুল ফুটেছে। পাহাড়ে নানা ফুল দেখা গেলেও এর রং ও গুচ্ছাকারে ফুটে থাকার সৌন্দর্য একেবারেই আলাদা।”
পথচারী আবদুর রহমান বলেন, “রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ সবুজের মধ্যে লাল ফুলগুলো চোখে পড়ে। প্রথমে মনে হয়েছিল কোনো বিশেষ জাতের ফুল। কাছে গিয়ে দেখলাম অসংখ্য ছোট ফুল একসঙ্গে ফুটে আছে। সত্যিই দেখলেই থমকে দাঁড়াতে হয়।”

প্রকৃতিপ্রেমী জাফর মিয়া বলেন, “পাহাড়ের সৌন্দর্য শুধু বড় বড় পাহাড় কিংবা ঝরনায় নয়; এমন ছোট ছোট বুনো ফুলও পাহাড়ের জীববৈচিত্র্যের সৌন্দর্য বহন করে। এসব উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা দরকার। প্রকৃতির নিজস্ব পরিবেশে ফুটে থাকা ফুলের সৌন্দর্যই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়।”
মাটিরাঙ্গা উপজেলা উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম জানান, “লালভান্ডির বা প্যাগোডা ফুল একটি আকর্ষণীয় শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ। পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে এ ধরনের দেশীয় উদ্ভিদের উপস্থিতি জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে। অপ্রয়োজনে গাছ কেটে ফেলা বা ফুলের গাছ নষ্ট না করে এগুলো সংরক্ষণ করা উচিত।”
পাহাড়ের সৌন্দর্য এমনিতেই বহুরূপী। কখনো মেঘ, কখনো কুয়াশা, কখনো পাহাড়ি ঝরনা, আবার কখনো নাম না-জানা বুনোফুল সেই সৌন্দর্যে যোগ করে নতুন মাত্রা। মাটিরাঙ্গার ওয়াছুর পাহাড়ি পথেও তেমনই এক নীরব সৌন্দর্যের গল্প বলছে প্যাগোডা ফুল।
সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে উঁকি দেওয়া রক্তিম ফুলগুলো যেন মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির সৌন্দর্য সবসময় বড় আয়োজন করে আসে না। কখনো কখনো পথের ধারে, কারও বাড়ির আঙিনায় কিংবা সবুজ পাতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্প। সেই গল্পেরই এক রক্তিম অধ্যায় হয়ে ওয়াছুর পাহাড়ি পথে ফুটে আছে ‘প্যাগোডা ফুল’।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।