কলকাতার মুসলিম কলোনিতে পানি নেই ৯০ দিনের বেশি; আছে পাশের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায়

কলকাতার মুসলিম কলোনিতে পানি নেই ৯০ দিনের বেশি; আছে পাশের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায়

কলকাতার মুসলিম কলোনিতে পানি নেই ৯০ দিনের বেশি; আছে পাশের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায়
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর কলকাতার শহরতলি দমদমের চিড়িয়া মোড় থেকে অটোতে করে কাশীপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরিতে যেতে সময় লাগে মাত্র পাঁচ থেকে সাত মিনিট। সেখান থেকে রাস্তা ধরে হেঁটে এক কিলোমিটারের মতো গেলেই পৌঁছানো যায় কাশীপুর জেটি ও ফেরি সার্ভিসে। পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে গঙ্গা, তাই চারদিকে কেবল পানি আর পানি। অথচ পান করার মতো এক ফোঁটা পানিও সেখানে নেই।

বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর, ২০২৬ সালের ২৯ মে থেকে কাশীপুরের চিৎপুর জ্যোতিনগর কলোনির পরিস্থিতি এমনই। ৯০ দিনের বেশি ধরে সেখানকার পানি সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সড়কবাতিও, অবশ্য সেগুলো আবার চালু করা হয়েছে।

কিন্তু কেন? স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এ কলোনিতে বসবাসকারী প্রায় ৫ হাজার মানুষ মুসলমান এবং তারা বিজেপিকে ভোট দেননি—এটাই মূল কারণ। তারা বলছেন, স্থানীয় বিজেপি এমএলএ রীতেশ তিওয়ারি নিজেই তাদের এ কথা বলেছেন এবং তার নির্দেশেই পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে বাসিন্দারা কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছেন। তবে প্রতিকার পাননি।

সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদক ওই কলোনিতে গিয়ে দেখেন, প্রতিটি বাড়ির বাইরে রাখা শুকিয়ে যাওয়া পানির পাত্র। সবগুলো খালি। খালি পাত্র বোঝাই করা একটি হাতে টানা ভ্যানের পাশে অপেক্ষা করছিল কয়েকজন কিশোরী। খাবার পানির খোঁজে অন্তত দেড় কিলোমিটার পথ হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তারা। প্রতিদিন এভাবেই তাদের পানির সন্ধানে যেতে হয়। কখনো কখনো তাদের পানির জন্য টাকা দিতে হয়, কখনো বিনামূল্যেও মেলে।

মাত্র ৫০০ মিটার দূরের হিন্দু বস্তির মানুষেরা দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য এক-আধ বালতি পানি দিয়ে যথাসম্ভব সাহায্য করেছেন। কিন্তু এভাবে তো আর দিনের পর দিন চলতে পারে না, তাছাড়া এর মধ্যে একটা ভয়ও লুকিয়ে আছে। কয়েকজন হিন্দু বাসিন্দা জানান, মুসলমান প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়ালে যদি তাদের পানি সরবরাহও একইভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, সেই আতঙ্কে ভুগছেন তারা।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার কয়েকদিন পরই এমএলএ বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি তার নির্বাচনি এলাকার মুসলিমদের জন্য কোনো কাজ না করার শপথ নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আজ বাবা ভোলেনাথের সামনে শপথ করছি, আগামী পাঁচ বছর আমি তাদের (মুসলিমদের) জন্য কোনো কাজ করব না। তাদের জন্য কোনো সনদও ইস্যু করব না। আমি এটি সরাসরি বলছি। অন্য কেউ কী বলল বা ভাবল তাতে আমার কিছু যায়-আসে না।’

অথচ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও বিভিন্ন হাইকোর্ট বারবার বলেছেন, পানি হলো মৌলিক অধিকার। কোনো শর্তেই তা থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। তারপরও চিৎপুরের কাছের জ্যোতিনগর কলোনির মানুষ ৯০ দিনের বেশি সময় ধরে পানি ছাড়াই বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

জ্যোতিনগর কলোনির বাসিন্দাদের প্রায় ৯৫ শতাংশই মুসলিম। তারা জীবিকার জন্য মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল। নারীরা সকালে ঘরের কাজ সামলে বিকেলে কাছের কারখানাগুলোতে কাজ করেন; সেখানে তারা কাচের বোতল পরিষ্কার করেন ও কাঁচের প্যানেল ভেঙে টুকরো করেন। আর বেশিরভাগ পুরুষই দিনমজুর, রাজমিস্ত্রি, গাড়িচালক, রিকশাচালক বা কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।

ছবি: দ্য ওয়্যার

কলোনির বাসিন্দারা বলেন, খাবার পানির পাঁচটি কল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর এ কাজ করা হয়েছে বস্তির বেশিরভাগ মানুষ মুসলমান হওয়ার কারণে। কলোনির বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, ‘পানি কেন বন্ধ করা হলো? কারণ আমরা মুসলমান। আমরা বহুবার বোরো অফিস ও থানায় জানিয়েছি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।’ আরজিনা বিবি ও আফরোজাও একই কথা ভিকেব।

রশমিলা খাতুন বলেন, মানুষ বাধ্য হয়ে নদীতে গোসল করছে। এতে নানা ধরনের চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে। শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না। বৃদ্ধ ও অসুস্থরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সবকিছুর জন্যই গঙ্গার এই পানি ব্যবহার করছি। দেখুন এর মধ্যে কত ময়লা আর আবর্জনা। আমাদের ছেলেমেয়েরা এখানেই গোসল করে। এমনকি ছয়-সাত মাসের শিশুদেরও ঘাটে এনে গোসল করানো হয়। এতে তাদের চামড়া লাল হয়ে যায়, ছোট্ট শরীরজুড়ে র‍্যাশ বের হয়।’

তার প্রতিবেশী রিক্তা বিবি দ্য ওয়্যারের কাছে আরও ভয়াবহ এক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগে আমাদের এক প্রতিবেশী মারা যান। দাফনের আগে আমাদের রীতি অনুযায়ী মৃতদেহকে গোসল দিয়ে কাফন পরাতে হয়। কিন্তু সেটার জন্যও আমাদের কাছে কোনো পানি ছিল না। শেষপর্যন্ত আমরা নদীর এই নোংরা পানি এনে তা দিয়েই গোসল দিয়েছি।’

স্থানীয়দের অল্ট নিউজকে বলেন, পানি সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। এলাকার পক্ষ থেকে স্থানীয় পৌর সংস্থা বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো অভিযোগও করা হয়নি। তবু কলকাতা পৌর সংস্থা ২৬ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত ওই এলাকায় পাইপলাইনের কাজ চালিয়েছিল।

মহিনুদ্দীন শেখ নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘পাইপলাইনের কাজ চলছিল। বস্তির সীমানা চিহ্নিত করার মতো করে তারা বস্তির শুরুতে একটি এবং শেষ প্রান্তে আরেকটি গর্ত খুঁড়েছিল। ২৮ জুলাই রাত ১১টার দিকে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন সকালে আমরা পানি আসার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু এরপর আর পানি সরবরাহ চালু হয়নি।’

যেখানে পাইপলাইনের কাজ করা হয়েছিল, বাসিন্দারা অল্ট নিউজকে সেই দুটি স্থান দেখিয়েছেন। তারা জানান, ওই দুই স্থানের মধ্যবর্তী পুরো অংশে পানি নেই। তারা আরও বলেন, এই নির্দিষ্ট এলাকার ঠিক আগে ও পরে থাকা কলগুলোতে পানি সরবরাহ চালু আছে; ওই কলগুলো মূলত হিন্দু অধ্যুষিত আবাসিক এলাকায় অবস্থিত।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সরস্বতী বিশ্বাস এ কলোনিতে ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, ‘দুই-তিন বছরের বাচ্চারা নদীর তীরে নেমে যাচ্ছে। মাত্র কয়েকদিন আগেই একটি শিশু প্রায় ডুবতে বসেছিল। যদি কিছু ঘটে যায়, তার দায় কে নেবে?’

সরস্বতী অল্ট নিউজকে বলেন, নবনির্বাচিত এমএলএ তিওয়ারি এলাকার বাসিন্দাদের ‘বাংলাদেশি ও অবৈধ দখলদার’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তিনি আমাদের বাংলাদেশি ও অবৈধ দখলদার বলছেন। আমি কীভাবে বাংলাদেশি হলাম? আমার পূর্বপুরুষরা এখানে থাকতেন। আমি যে একজন ভারতীয়, তার সপক্ষে বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। আমি এই বছরও ভোট দিয়েছি।’

ছবি: অল্ট নিউজ

বাসিন্দাদের অভিযোগ, জরুরি সেবা বন্ধ করে দেওয়া মূলত বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করার সুপরিকল্পিত চেষ্টার অংশ। জ্যোতিনগর কলোনির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর বিশ্বাস বলেন, ‘পরিকল্পনাই ছিল পানি ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো বন্ধ করে দেওয়া, যাতে আমরা এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হই।’

আরেক বাসিন্দা মর্জিনা বেগমও বলেন, ‘তারা আমাদের এই কলোনি থেকে উচ্ছেদ করার পাঁয়তারা করছে। সে কারণেই পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার মতো কৌশল বেছে নিয়েছে।’

এমএলএ তিওয়ারির সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া একদল নারী বলেন, এমএলএ তাদের গালিগালাজ করেছেন এবং ধর্মীয় অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। এক বয়স্ক নারী সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘তিনি আমাদের কোনো সম্মান না দিয়ে তুই-তোকারি করেছেন। তিনি বলেন, তোরা কেন মসজিদ বানিয়েছিস আর সেখানে আল্লাহকে ডাকিস? তোরা কি কখনও তাকে দেখেছিস? ঘরে বসে প্রার্থনা করতে পারিস না? যা, যা এখান থেকে। আমি তোদের পানি বন্ধ করিনি। আমি তোদের জন্য কিছুই করতে পারব না।’ ওই দলে থাকা স্বাতী বিবি বলেন, ‘এমএলএ আমাদের আদালতে যেতে বলেছেন। বলেছেন, এটা কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের জমি; আমরা তা জবরদখল করে আছি। এ কারণেই পানি এবং এর আগে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।’

ওই কলোনিরই বাসিন্দা ও পেশায় দোকানদার মইনুদ্দিন শেখ বলেন, ‘আমাদের সব অনুরোধ যখন ব্যর্থ হলো এবং প্রশাসন কর্ণপাত করল না, তখন আমরা বাধ্য হয়ে আগে কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছি।’

উচ্ছেদ অভিযান থেকে আইনি সুরক্ষা পেতে কলোনির বাসিন্দারা কলকাতার সিটি সিভিল কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে আপিল করেছিলেন। তবে গত ১৮ আগস্ট আদালত তাদের উচ্ছেদ থেকে কোনো ধরনের সুরক্ষা বা দায়মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

কলোনির বাসিন্দারা বলেন, তারা কয়েক দশক ধরে এখানে বসবাস করছেন। সরকার এসেছে, সরকার গেছে, কিন্তু কেউই শুধু ধর্মের ভিত্তিতে কলোনির মানুষদের সঙ্গে এমন আচরণ করেনি। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমরা যদি জবরদখলকারীই হই, তবে গত সত্তর বছরে কেউ সে কথা কেন বলেনি?’

বাবু গাজী প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের বস্তিটি একটি নিবন্ধিত বস্তি। হঠাৎ করে এটা কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের জমি হয়ে গেল কীভাবে? আর কীভাবেই বা তারা আমাদের উচ্ছেদ করতে চাইতে পারে?’

বাসিন্দাদের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর স্থানীয় বিজেপি সমর্থকরা বস্তিটি ভেঙে ফেলার জন্য প্রচারণা শুরু করে। তারা কলোনিটিকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের আস্তানা’ হিসেবে আখ্যা দিতে শুরু করে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে দ্য ওয়্যারের পক্ষ থেকে এমএলএ রীতেশ তিওয়ারি, কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কমিশনার স্মিতা পান্ডে ও কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের জনসংযোগ কর্মকর্তা সঞ্জয় মুখার্জির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে ৩১ আগস্ট প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তাদের কেউই সাড়া দেননি।

ছবি: দ্য ওয়্যার

তবে অল্ট নিউজ তিওয়ারিকে তার নির্বাচনি এলাকার মানুষের এই চরম দুর্দশার কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। এই এমএলএ বলেন, ‘জমিটি বন্দর কর্তৃপক্ষের। মানুষের সঙ্গে বন্দরের বিরোধ চলছে। বন্দর তাদের জায়গা খালি করার নির্দেশ দিয়েছিল। পরে হাইকোর্ট সাময়িকভাবে কোনো জোরজুলুম বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পানি সরবরাহ করে থাকে কেএমসি। তাহলে এখানে আমার ভূমিকা কী?’

তিনি নিজের নির্বাচনি এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে পানি সরবরাহ পুনরায় চালু করতে কোনো সাহায্য করতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিওয়ারি বলেন, ‘এটি আমার কাজ নয়…তারা (বাসিন্দারা) প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতাদের কাছে সাহায্য চেয়েছেন…তাই যাদের তারা ডেকেছেন, তাদের ওপরই তাদের আস্থা রাখা উচিত। এত তাড়াতাড়ি কি তাদের সেই আস্থা হারিয়ে ফেলা উচিত?’

নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষকে কেন তিনি সাহায্য করছেন না—এ বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করা হলে বিধায়ক উত্তর দেন, ‘আমার ভাগের কাজটা আপনি করে দেবেন!’

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *