ছানিমুক্তির পথে খাগড়াছড়ির দুর্গম এলাকার ৮৪ জন মানুষ, পাশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মানবিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় খাগড়াছড়ি জোনের উদ্যোগে আয়োজিত বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প থেকে ছানি অপারেশনের জন্য নির্বাচিত ৮৪ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অসহায় মানুষের চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) প্রথম ধাপে নির্বাচিত এসব রোগীকে চট্টগ্রাম লায়ন্স হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাদের ছানি অপারেশনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে। চিকিৎসা কার্যক্রম শেষে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় রোগীদের আবার খাগড়াছড়িতে ফিরিয়ে আনা হবে।

এর আগে, গত ১৯ আগস্ট পানছড়ি উপজেলা মডেল মসজিদ কমপ্লেক্সে খাগড়াছড়ি জোনের উদ্যোগে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। দুর্গম এলাকার মানুষের জন্য আয়োজিত ওই ক্যাম্পে বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৫৫ জন রোগীকে ছানি অপারেশনের জন্য শনাক্ত করা হয়। তাদের মধ্য থেকে প্রথম ধাপে ৮৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে। অবশিষ্ট ৭১ জন রোগীকেও পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম লায়ন্স হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
প্রথম ধাপে চট্টগ্রামে পাঠানো ৮৪ জন রোগীর মধ্যে ৪৬ জন পাহাড়ি এবং ৩৮ জন বাঙালি জনগোষ্ঠীর। তাদের মধ্যে ৩৪ জন পুরুষ ও ৫০ জন নারী রয়েছেন। অর্থাৎ কোনো ধরনের জাতিগত বা সামাজিক বিভাজন ছাড়াই প্রয়োজন ও চিকিৎসার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে রোগীদের নির্বাচিত করে চিকিৎসার আওতায় আনা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ভৌগোলিক বাস্তবতায় প্রত্যন্ত এলাকার অনেক মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে অনেকের পক্ষে চোখের ছানি অপারেশনের মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যয় বহন করাও সম্ভব হয় না। ফলে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন কষ্টে থাকা এসব মানুষের জন্য সেনাবাহিনীর বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প এবং পরবর্তী সময়ে অপারেশনের ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সহায়তা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে ছানি এমন একটি সমস্যা, যা সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার কারণে বয়স্ক মানুষদের চলাফেরা, দৈনন্দিন কাজকর্ম ও পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই সংকট আরও প্রকট। তাই শুধু ক্যাম্পে রোগী দেখে পরামর্শ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে শনাক্ত রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া এবং চিকিৎসা শেষে নিজ এলাকায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সেনাবাহিনীর জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে।

খাগড়াছড়ি জোনের এ উদ্যোগের আরেকটি তাৎপর্য হলো—এখানে পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর মানুষ সমানভাবে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন। চিকিৎসার মতো মৌলিক মানবিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে দুই জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির পরিবেশ আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের পরিবেশ গড়ে তুলতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
দুর্গম এলাকার মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, অসচ্ছল রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ করে দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরে নেওয়ার মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের মানবিক দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য চিকিৎসার পথকে সহজ করার পাশাপাশি এসব উদ্যোগ সাধারণ মানুষের সঙ্গে সেনাবাহিনীর পারস্পরিক আস্থা ও সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে ভূমিকা রাখছে।
চোখের আলো ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা ৮৪ রোগীর জন্য চট্টগ্রামে পাঠানোর এই যাত্রা তাই কেবল একটি চিকিৎসা কার্যক্রম নয়; তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনারও একটি নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে অবশিষ্ট ৭১ জন রোগীকেও একইভাবে চিকিৎসার আওতায় আনার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুর্গম পার্বত্য এলাকার আরও মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। মানবিক সহায়তার মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সেনাবাহিনীর এ ধরনের উদ্যোগ পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও আশাব্যঞ্জক।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।