প্রাণবন্ত ইয়াও ওয়েন: বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের এক দৃশ্যমান মুখ

প্রাণবন্ত ইয়াও ওয়েন: বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের এক দৃশ্যমান মুখ

প্রাণবন্ত ইয়াও ওয়েন: বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের এক দৃশ্যমান মুখ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন

১৯৮৮ সাল থেকে চীনা ভাষা শিক্ষা এবং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের উন্নয়নে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সেমিনার, কূটনৈতিক অনুষ্ঠান ও অন্যান্য কর্মসূচিতে যোগাযোগের সুযোগ হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকেই দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তবে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও পর্যবেক্ষণ আমাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস), চীনা দূতাবাস, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ হয়েছে। প্রতিবারই তাঁকে প্রাণবন্ত, সহজগ্রহণযোগ্য, সময়নিষ্ঠ, প্রস্তুতিপূর্ণ এবং প্রতিটি কর্মসূচির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অত্যন্ত মনোযোগী হিসেবে দেখেছি।

আজকের ঢাকায় যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে কোনো কর্মসূচিতে পৌঁছানোই অনেক সময় একটি অর্জন। অথচ ইয়াও ওয়েন ঢাকার ব্যস্ততম যানজটের মধ্যেও অত্যন্ত সক্রিয় কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর নিয়মিত বৈঠক, সেমিনার, বিশ্ববিদ্যালয় সফর, গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময় এবং সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ দেখে মনে হয়—এই কূটনীতিক যেন কখনোই স্থির থাকেন না।

অভিজ্ঞতার পেছনে যে কর্মচাঞ্চল্য

রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশে এসে চীনের ১৬তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৭৩ সালের আগস্টে জন্মগ্রহণ করেন এবং আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর আগের কূটনৈতিক কর্মজীবনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও পাকিস্তানে চীনা মিশনে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়াবিষয়ক বিভাগ এবং উত্তর আমেরিকা ও ওশেনিয়াবিষয়ক বিভাগেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই আঞ্চলিক ও নীতিনির্ধারণী অভিজ্ঞতা তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যেও স্পষ্ট। সেমিনার ও সাক্ষাৎকারে তিনি সাধারণত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান, ঘটনা ও নীতিগত তথ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়ে কথা বলেন। বাণিজ্য, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, রোহিঙ্গা ইস্যু, আঞ্চলিক যোগাযোগ কিংবা আন্তর্জাতিক বিষয়—যে বিষয়ই হোক না কেন, তিনি সাধারণত শুধু কূটনৈতিক বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি না করে বৃহত্তর প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।

বাংলাদেশে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তাঁর কর্মকাণ্ডে এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়। দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি সফর করে উচ্চশিক্ষা, চীনা ভাষা শিক্ষা ও যুব বিনিময় নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি ফরেন সার্ভিস একাডেমি এবং ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজেও বক্তব্য দেন এবং কূটনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে সরাসরি মতবিনিময় করেন।

এক অসাধারণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কূটনীতি

ইয়াও ওয়েনের মেয়াদের সম্ভবত সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বৈশিষ্ট্য হলো—এর সময়কাল।

তিনি বাংলাদেশে দায়িত্ব শুরু করেন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। এরপর প্রত্যক্ষ করেন ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের সংসদীয় নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের সময়ও তিনি দায়িত্ব অব্যাহত রাখেন।

একজন রাষ্ট্রদূতের জন্য এত বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা যথেষ্ট কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার দাবি রাখে। ইয়াও ওয়েনের কর্মকাণ্ডে দেখা যায়, তিনি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে যেমন যোগাযোগ রেখেছেন, তেমনি সরকারবহির্ভূত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন। পরিবর্তনকালীন সময়ে তিনি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনের পরও নতুন সরকার, বিরোধী দল ও সংসদীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন।

চীনা দূতাবাস বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধি, তরুণ, শিক্ষার্থী ও নারীদের অংশগ্রহণে প্রশিক্ষণ ও বিনিময় কর্মসূচিও আয়োজন ও সহযোগিতা করেছে। উদাহরণ হিসেবে, ২০২৬ সালের জুনে বিএনপির যুব, ছাত্র ও নারী প্রতিনিধিদের একটি দল চীন সফর করে। এ ধরনের অন্যান্য কর্মসূচিতেও সরকারি কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছেন।

এসব কার্যক্রম থেকে বোঝা যায়, তাঁর কূটনৈতিক তৎপরতা শুধু একটি নির্দিষ্ট সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক ও জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে বিস্তৃত।

তিনটি উচ্চপর্যায়ের সফর, তিনটি রাজনৈতিক অধ্যায়

ইয়াও ওয়েনের দায়িত্বকাল বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চীন সফর করেন। ওই সময় দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ পর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০২৫ সালকে বাংলাদেশ-চীন জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও বিনিময় বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, পর্যটন ও যুব বিনিময়ে সহযোগিতা সম্প্রসারণের কথা তুলে ধরেন এবং জানান, তখন প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী চীনে পড়াশোনা করছিলেন।

এরপর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৫ সালের মার্চে চীন সফর করেন এবং বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ায় অংশ নেন। ওই সফর থেকে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার বেশ কিছু ফলাফল আসে।

এরপর ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো চীন সফর করেন। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যৌথভাবে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গঠনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।

রাষ্ট্র পর্যায়ের এসব অর্জন দুই দেশের নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ফল। তবে এ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ও চীনা দূতাবাসের নিবিড় কূটনৈতিক প্রস্তুতি, যোগাযোগ ও পরবর্তী কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের পরপরই তিনি ৩০টিরও বেশি শীর্ষস্থানীয় বাংলাদেশি সাংবাদিককে সফরের ফলাফল সম্পর্কে অবহিত করেন এবং দ্রুত বাস্তবায়নমুখী বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।

চুক্তি থেকে বাস্তব সহযোগিতায়

রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের দায়িত্বকালের একটি দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য হলো—কূটনৈতিক সমঝোতাকে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া।

২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় চীনের মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে চীনা রেড ক্রস সোসাইটির ত্রাণসামগ্রী হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত ছিলেন।

স্বাস্থ্য খাতেও সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। চীন বাংলাদেশকে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিশেষায়িত সহায়তা দিয়েছে এবং চীনের বিভিন্ন হাসপাতাল বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ ক্রমশ বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে চীনে চিকিৎসার জন্য বিশেষ ভিসা সুবিধা চালু করা হয়। পরবর্তীতে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশ-চীন যৌথ কার্ডিওভাসকুলার রোগ ক্লিনিক প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনের সহায়তায় রোবোটিক পুনর্বাসন কেন্দ্রও চালু হয়েছে।

শিক্ষা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বৃত্তি, যুব বিনিময়, চীনা ভাষা শিক্ষা এবং বার্ষিক ‘চাইনিজ ব্রিজ’ প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ২৫তম ‘চাইনিজ ব্রিজ’ প্রতিযোগিতার জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে ২০০-এর বেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অংশ নেন।

বাণিজ্য, কৃষি ও যোগাযোগ

ইয়াও ওয়েন বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনা বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর বারবার গুরুত্ব দিয়েছেন। ২০২৫ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি তাজা আমের চালান চীনে পাঠানো হয়। এরপর ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশি তাজা কাঁঠাল চীনে রপ্তানির অনুমোদন পাওয়া যায়। বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের জন্য চীনের বাজারে প্রবেশাধিকার ক্রমাগত সম্প্রসারণের নীতি রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সম্ভাবনাময় ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকায় চীনা ভিসা আবেদন কেন্দ্র চালু হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল চীন ভ্রমণকে আরও সহজ ও কার্যকর করা।

অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতাও তাঁর দায়িত্বকালে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্পসহ চীনের সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প এগিয়ে চলেছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

যোগাযোগমুখী এক কূটনীতিক

রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের আরেকটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো গণমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। কূটনৈতিক সংবাদদাতাদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ বিশেষভাবে দৃশ্যমান। ২০২৫ সালের ডিসিএবি টকে তিনি অর্থনৈতিক ও চিকিৎসা সহযোগিতা, তিস্তা, রোহিঙ্গা ইস্যু এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যম কার্যালয়ও পরিদর্শন করেছেন এবং বাংলাদেশি সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।

তাঁর জনকূটনীতি শুধু ঢাকার কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগের বিভিন্ন কর্মসূচিও তাঁর নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। ২০২৫ সালে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত ঢাকা-চীন দিবস এর একটি উদাহরণ, যেখানে ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অংশগ্রহণ করেন।

সরকার-টু-সরকার সম্পর্কের বাইরে

বাংলাদেশ-চীন জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে মতবিনিময় করতে দেখেছি। এর মধ্যে অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-চায়না অ্যালামনাই এবং উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড উল্লেখযোগ্য। তাঁর সঙ্গে এসব যোগাযোগ সাধারণত প্রাণবন্ত, উৎসাহব্যঞ্জক ও বাস্তবমুখী হয়েছে।

আমার পর্যবেক্ষণে, তিনি উপলব্ধি করেন যে দুই দেশের টেকসই সম্পর্ক শুধু মন্ত্রণালয় এবং সরকারি চুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না; এর জন্য ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ব্যবসা, তরুণ সমাজ এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগও অপরিহার্য।

বাংলাদেশে কর্মরত চীনা জনগোষ্ঠী ও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও তাঁর একই ধরনের সম্পৃক্ততা দেখা যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন এবং প্রবাসী চীনা সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ উল্লেখযোগ্য।

একটি স্বতন্ত্র মেয়াদ

বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রতিটি চীনা রাষ্ট্রদূত তাঁদের নিজ নিজ সময় ও বাস্তবতায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। তবে ইয়াও ওয়েনের দায়িত্বকাল ছিল তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রমী ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। তাঁর মেয়াদে একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন, অন্তর্বর্তী সরকার, একটি জাতীয় নির্বাচন এবং নতুন নির্বাচিত সরকারের যাত্রা—সবই সংঘটিত হয়েছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

আমার পর্যবেক্ষণে তাঁকে আলাদা করে চেনায় শুধু তাঁর দৃশ্যমান উপস্থিতি নয়; বরং প্রস্তুতি, সহজপ্রাপ্যতা, দ্রুত যোগাযোগ এবং একই সঙ্গে একাধিক পর্যায়ে যোগাযোগের পথ খোলা রাখার দৃঢ়তা।

তিনি যে সম্পর্কের প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেটি এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গঠনের যে লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে, তা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং মানব উন্নয়নে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়াই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

১৯৮৮ সাল থেকে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগের অভিজ্ঞতা থেকে আমি তাই রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে শুধু বাংলাদেশে চীনের নীতির প্রতিনিধিত্বকারী একজন কূটনীতিক হিসেবে দেখি না; বরং সমকালীন জনকূটনীতি ও উন্নয়নমূলক কূটনীতির একজন বিশেষভাবে কর্মচঞ্চল প্রতিনিধি হিসেবে দেখি।

তাঁর দায়িত্বকাল এখনো চলমান। তাই এর চূড়ান্ত ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ভবিষ্যতের বিষয়।

তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই অস্বীকার করা কঠিন—

রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন একজন নিরন্তর কর্মচঞ্চল কূটনীতিক—যিনি বর্তমানের জন্য প্রস্তুত, জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ে দৃশ্যত অবিচল।

লেখক: লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন, পিএসসি, এমবিএ, এমডিএস
বেইজিং ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার ইউনিভার্সিটি থেকে চীনা ভাষায় গ্র্যাজুয়েট
অ্যাডজাঙ্ক্ট প্রফেসর, ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ (আইপিএল), বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি
প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব, উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড
প্রোপ্রাইটর ও শিক্ষক, ঝং মেং চাইনিজ একাডেমি
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও চীনা ভাষা শিক্ষা বিষয়ক প্রমোটার, কনসালট্যান্ট, উচ্চতর দোভাষী ও গবেষক
প্রাপক, চায়না-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০২৩
shahadatb@gmail.com