সীমান্তে ধারাবাহিক অভিযানের সাফল্য, রামগড়ে ৩ কোটি টাকার মাদক ধ্বংস করল বিজিবি
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার রামগড়ে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)–এর ধারাবাহিক অভিযানে জব্দ করা প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য আনুষ্ঠানিকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। মদ, বিয়ার, ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা, চোলাই মদ, ভারতীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট, বিভিন্ন ধরনের ট্যাবলেটসহ নেশাজাতীয় এসব পণ্য সীমান্তপথে চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে বিজিবি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল ১১টায় রামগড় পৌরসভার তৈচালাপাড়াস্থ রামগড় ব্যাটালিয়ন (৪৩ বিজিবি) সদরের বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে এ মাদকদ্রব্য ধ্বংস করা হয়।
খাগড়াছড়ির বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাজেদ হোসাইনের উপস্থিতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজিবির চট্টগ্রাম রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সোহেল আহমেদ।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গুইমারা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. মিজানুর রহমান, রামগড় ব্যাটালিয়ন (৪৩ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আহসান উল ইসলাম, খেদাছড়া ব্যাটালিয়ন (৪০ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুহাঃ শাহীনুল ইসলাম, যামিনীপাড়া ব্যাটালিয়ন (২৩ বিজিবি) অধিনায়ক (ভারপ্রাপ্ত) মেজর মো. মঈনুল আলম, রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী শামীম, খাগড়াছড়ি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আবদুল হামিদ এবং রামগড় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজির আলম। এ ছাড়া স্থানীয় হেডম্যান-কারবারি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিজিবি জানায়, গুইমারা সেক্টরের অধীন যামিনীপাড়া ব্যাটালিয়ন (২৩ বিজিবি), খেদাছড়া ব্যাটালিয়ন (৪০ বিজিবি) ও রামগড় ব্যাটালিয়ন (৪৩ বিজিবি)–এর বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় পরিচালিত অভিযানে এসব মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মালিকবিহীন অবস্থায় জব্দ করা এসব মাদকদ্রব্য বিধি অনুযায়ী ধ্বংস করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন বিওপির নিয়মিত টহল, তল্লাশি ও বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে এসব চোরাচালান পণ্য জব্দ করা হয় বলে জানিয়েছে বিজিবি।

ধ্বংস করা মাদকদ্রব্যের তালিকায় ছিল বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ ও বিয়ার, ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা, চোলাই মদ, ভারতীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য। এসব মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা বলে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ হওয়ার বিষয়টি সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নিয়মিত নজরদারি ও চোরাচালানবিরোধী তৎপরতার ব্যাপ্তি তুলে ধরে। সীমান্তপথে মাদক প্রবেশের সম্ভাব্য রুটগুলোতে টহল জোরদার, সন্দেহজনক গতিবিধির ওপর নজর রাখা এবং বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে মাদক চোরাচালান ঠেকাতে কাজ করছে বিজিবি। জব্দ করা মাদকদ্রব্য ধ্বংসের মধ্য দিয়ে এসব অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে এসেছে—চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করা মাদক যাতে পুনরায় বাজারে ফিরে যেতে না পারে, সে জন্য আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে তা ধ্বংস করা হচ্ছে।

মাদকদ্রব্য ধ্বংস অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সোহেল আহমেদ মাদককে সমাজের জন্য ভয়াবহ হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মাদক নির্মূলের উদ্যোগ নিজেদের ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। অস্ত্র বা বহিঃশত্রুর আক্রমণ মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও মাদকের বিস্তার সমাজের ভেতর থেকে ক্ষতি করে এবং এর প্রভাব মোকাবিলা করা আরও কঠিন।
তিনি বলেন, সীমান্তে মাদকের প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ ও ধ্বংস করা অবশ্যই অভিযানের একটি ফল, তবে সীমান্ত দিয়ে এক পিস মাদকও যাতে দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্য। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বিজিবি সীমান্তে নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রাখবে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সোহেল আহমেদ আরও বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়; সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে এ কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সীমান্তবর্তী রামগড়, গুইমারা ও আশপাশের এলাকায় মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির এসব অভিযান স্থানীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সীমান্তের দুর্গম এলাকা ব্যবহার করে মাদক পাচারের চেষ্টা প্রতিহত করতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে একদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার হচ্ছে, অন্যদিকে মাদকদ্রব্যের বড় চালান দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের আগেই আটকে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বিজিবির চোরাচালানবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন। সীমান্ত এলাকায় মাদক ও অন্যান্য অবৈধ পণ্যের প্রবেশ ঠেকাতে বিভিন্ন বাহিনী ও প্রশাসনের সমন্বিত তৎপরতা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনগণের উপস্থিতিতে মাদকদ্রব্য ধ্বংসের এ আয়োজনের মাধ্যমে মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির একটি বার্তাও দেওয়া হয়েছে। শুধু সীমান্তে মাদক আটক নয়, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পায়।

বিজিবি জানিয়েছে, দেশের সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে তাদের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। সীমান্তে মাদক প্রবেশের পথ বন্ধ করতে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, তল্লাশি ও বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে জব্দ করা মাদকদ্রব্য আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে ধ্বংস করার কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে।
রামগড়ে প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের বিপুল মাদকদ্রব্য ধ্বংসের ঘটনা তাই কেবল জব্দ করা মাদকের পরিমাণের হিসাব নয়; এটি সীমান্তে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত বিজিবির চোরাচালানবিরোধী তৎপরতার একটি দৃশ্যমান ফলাফল। সীমান্তপথে মাদক প্রবেশের আগেই তা শনাক্ত ও জব্দ করার পাশাপাশি মাদকের চালান বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ বন্ধ করতে বিজিবির ধারাবাহিক অভিযান সীমান্ত নিরাপত্তা ও মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।