এনসিটি নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের দাবি, সরকারের কাছে ৬ প্রশ্ন স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি। সংগঠনটির দাবি, চুক্তিতে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষিত হয়নি। এ বিষয়ে সরকারের কাছে ছয়টি প্রশ্নের উত্তরও চেয়েছে তারা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সংগঠনটির আহ্বায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হক, সদস্যসচিব শাহাদাত ফরাজী সাকিব ও মুখপাত্র মুহিউদ্দিন রাহাতের লিখিত বক্তব্যে চুক্তির আর্থিক কাঠামো, টার্মিনালের পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মডেল নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
সংগঠনটির রিসার্চ উইংয়ের দাবি, প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে চুক্তিতে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদের মতে, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক কাঠামো ও শর্ত প্রকাশ না করায় এর সম্ভাব্য সুফল-ক্ষতি মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির প্রথম প্রশ্ন, সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ‘অপারেটর’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী চুক্তিটি কনসেশনভিত্তিক। সংগঠনটির মতে, অপারেটর ও কনসেশনিয়ারের অধিকার এবং দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে ডিপি ওয়ার্ল্ড কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনাগত অধিকার পাবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি এনসিটির সম্পদের মূল্য ও প্রাথমিক ফি নিয়ে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, টার্মিনালের দায়িত্ব নেওয়ার আগে ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রায় ৬০০ কোটি টাকা আপফ্রন্ট ফি দেওয়ার কথা জানিয়েছে। অথচ এনসিটির অবকাঠামো, ক্রেন, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য খাতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগ কয়েক হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় টার্মিনালের সম্পদ, আয়-উৎপাদন সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে ৬০০ কোটি টাকার অঙ্ক নির্ধারণের ভিত্তি কী, তা জানতে চেয়েছে সংগঠনটি।
তৃতীয় প্রশ্নে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণের সঙ্গে এনসিটির বর্তমান আয় তুলনা করেছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ১০ বছরে এনসিটির আধুনিকায়নে ডিপি ওয়ার্ল্ড এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে, সংগঠনটির হিসাবে, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় এনসিটি এক অর্থবছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং থেকে প্রায় এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা নিট আয় করেছে।

এই হিসাবের ভিত্তিতে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির প্রশ্ন, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় অর্জিত আয় থেকেই টার্মিনালের আধুনিকায়ন করা সম্ভব কি না, তা বিবেচনা না করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হলো কেন। পাশাপাশি টার্মিনালের আয় কীভাবে বণ্টিত হবে এবং এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কোনো চাপ তৈরি হবে কি না, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চেয়েছে সংগঠনটি।
চতুর্থ প্রশ্নটি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা নিয়ে। স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় এনসিটি প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ (TEU) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। অন্যদিকে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের জন্য বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রার কথা প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। তাদের প্রশ্ন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রত্যাশা থাকলে ন্যূনতম লক্ষ্যমাত্রা আগের পরিচালনাগত অর্জনের চেয়ে কম রাখা হলো কেন।
পঞ্চম প্রশ্নে চুক্তির আওতায় সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তাদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় প্রতি টিইইউ থেকে প্রশাসনিক ব্যয় বাদ দেওয়ার পর নিট আয় প্রায় ১০৬ দশমিক ৮২ ডলার এবং বছরে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ হ্যান্ডলিংয়ের ভিত্তিতে মোট নিট আয় প্রায় ১৪৮ মিলিয়ন ডলার হতে পারে। অন্যদিকে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবের প্রকাশিত হিসাব ধরে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতি টিইইউ আয় থেকে একই ধরনের প্রশাসনিক ব্যয় বাদ দিলে নিট আয় প্রায় ৪২ দশমিক ৫০ ডলার এবং বছরে ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ হ্যান্ডলিংয়ের ভিত্তিতে আয় প্রায় ৫২ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে দাবি করেছে তারা।
এ হিসাবে দুই ব্যবস্থাপনার মধ্যে বছরে প্রায় ৯৫ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় এক হাজার ১৮০ কোটি টাকার পার্থক্য হতে পারে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক কাঠামো প্রকাশ না হওয়ায় তাদের এই হিসাব প্রাথমিক বলে বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের কাছে চুক্তির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে তারা।
ষষ্ঠ প্রশ্নে বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধিতা নয়, বরং এনসিটি পরিচালনায় শতভাগ বিদেশি কনসেশন মডেলের যৌক্তিকতা নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি। সংগঠনটির বক্তব্য, সিঙ্গাপুরের বন্দর পরিচালনায় দেশীয় ব্যবস্থাপনা এবং ভিয়েতনামের কিছু টার্মিনালে যৌথ অংশীদারত্বের মডেল অনুসরণ করা হয়। এসব উদাহরণ বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশেও দেশীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের সুযোগ ছিল বলে মনে করে তারা।
সংগঠনটির দাবি, এনসিটি পুরোপুরি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার ফলে দেশীয় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে দেশে গড়ে ওঠা বন্দর পরিচালনাশিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে তারা।
বক্তব্যে চুক্তির অর্থনৈতিক দিকের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়। সংগঠনটির মতে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায় দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি চুক্তির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির পাশাপাশি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির উত্থাপিত আর্থিক হিসাব ও চুক্তি নিয়ে আপত্তিগুলো সংগঠনটির নিজস্ব বিশ্লেষণ ও দাবি। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত, আয় বণ্টনের কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে বিষয়গুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই ও মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
সমাবেশ থেকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি পরিচালনা-সংক্রান্ত চুক্তি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানায় স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি। একই সঙ্গে চুক্তির শর্ত, আর্থিক কাঠামো ও সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সরকারের কাছে উত্থাপিত ছয়টি প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দেওয়ার আহ্বান জানায় সংগঠনটি।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।