কুতুবদিয়ায় আগুনে পুড়ল ৩৩ ঘর, নিঃস্ব ৩৩ পরিবার
![]()
চিকিৎসার জন্য ঋণ করা এক লাখ টাকা ও শিক্ষাগত সনদও পুড়ে ছাই
জার্নাল প্রতিবেদক
কেউ হারিয়েছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই, কেউ সারা জীবনের জমানো অর্থ। আবার কারও পুড়ে গেছে চিকিৎসার জন্য ঋণ করে রাখা টাকা, শিক্ষাগত যোগ্যতার মূল সনদসহ মূল্যবান কাগজপত্র। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের জেলেপাড়ার অন্তত ৩৩টি পরিবারের সদস্যরা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ভোররাতে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে পুড়ে যায় এলাকার ৩৩টি কাঁচা-পাকা বসতঘর। ঘরবাড়ির পাশাপাশি আসবাবপত্র, নগদ টাকা, পোশাক ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনে সর্বস্ব হারিয়ে এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত দুইটার দিকে দিদার জলদাসের বাড়িতে প্রথম আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশাপাশি থাকা অন্য ঘরগুলোতে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় ভোর পাঁচটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এরই মধ্যে পুড়ে যায় ৩৩টি বসতঘর।
কুতুবদিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা সোহেল আহমেদ বলেন, রাত দুইটার দিকে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট রাত ২টা ৩২ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ভোর পাঁচটার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। এর আগেই ৩৩টি কাঁচা-পাকা ঘর পুড়ে যায়। প্রাথমিকভাবে চুলার আগুন থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চিকিৎসার ঋণের টাকাও রক্ষা করতে পারেননি নয়ন দাস
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে পবিরন দাসের পরিবারের দুর্দশা আরও করুণ। তাঁর স্ত্রী নয়ন দাস জানান, পিত্তথলির অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁরা এক লাখ টাকা ঋণ করে রেখেছিলেন। কিন্তু আগুনে সেই নগদ টাকার পাশাপাশি তাঁর স্বামীর ডিগ্রির মূল সনদসহ ঘরের সবকিছু পুড়ে গেছে।
চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর জন্য ঋণ করে রাখা অর্থ হারিয়ে এখন দিশেহারা পরিবারটি। একদিকে অসুস্থতার চিকিৎসা, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ—সব মিলিয়ে তাঁদের সামনে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। মাথা গোঁজার ঠাঁই ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হারিয়ে পরিবারটি কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
শুধু নয়ন দাসের পরিবারই নয়, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত অন্য পরিবারগুলোরও একই রকম দুর্ভোগ। কারও ঘরের আসবাবপত্র, পোশাক ও দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী পুড়ে গেছে, আবার কেউ হারিয়েছেন দীর্ঘদিনের সঞ্চয়। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে নানা দাপ্তরিক কাজেও তাঁদের ভোগান্তিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত ছড়ায় আগুন
স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল জানান, প্রথমে দিদার জলদাসের বাড়িতে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় লোকজনও আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। তবে ঘরগুলো কাছাকাছি ও এক সারিতে থাকায় আগুন দ্রুত আশপাশের বসতঘরে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তীব্রতায় বাসিন্দারা ঘরের মালামাল সরিয়ে নেওয়ারও পর্যাপ্ত সুযোগ পাননি।
আলী আকবর ডেইল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আখতার কামাল সিকদার বলেন, খবর পেয়ে তিনি রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘরগুলো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পাশাপাশি থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে অন্তত ৩২ থেকে ৩৩টি ঘর পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জরুরি সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জরুরি সহায়তা ও পুনর্বাসনের দাবি
অগ্নিকাণ্ডে বসতঘর হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই এখন আশ্রয়, খাবার, পোশাক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকটে পড়েছেন। আগুনে নগদ অর্থ, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও জীবিকার উপকরণ হারানো পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত অস্থায়ী আশ্রয়, খাদ্যসামগ্রী, পোশাক ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব পরিবার চিকিৎসার অর্থ, সঞ্চয় ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র হারিয়েছে, তাদের পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।