ফানুস উৎসবের বর্ণিল আয়োজনের পর এবার কল্পজাহাজ ভাসানোর আনন্দে মেতেছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ। বাঁশ, কাঠ, বেত ও রঙিন কাগজে নান্দনিক কারুকাজে তৈরি জাহাজগুলো নৌকায় বসিয়ে ভাসানো হচ্ছে নদীতে। জাহাজে জাহাজে চলছে গান, নাচ ও বৌদ্ধ কীর্তন। নদীর দুই পাড়ে জড়ো হয়েছেন হাজারো দর্শনার্থী। ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি উৎসবটি পরিণত হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলনমেলায়। সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে কক্সবাজারের রামু উপজেলার বাঁকখালী নদীর চেরাংঘাটা এলাকায় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরে শুরু হওয়া এ উৎসব বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণে আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে। বৌদ্ধদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে যুগ যুগ ধরে এ নদীতে কল্পজাহাজ ভাসানোর আয়োজন হয়ে আসছে। কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে রামু উপজেলা সদর পেরিয়ে বাঁকখালী নদীর ঘাট। সোমবার বিকেল ৩টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নদীর দুই পাড়ে মানুষের ভিড়। গান-বাজনা, কীর্তন ও ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে উৎসবে মেতেছেন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। পাঁচ থেকে ছয়টি কাঠের নৌকার ওপর বসানো হয়েছে কল্পজাহাজ। এর মধ্যে দুটি জাহাজে ব্যবহার করা হয়েছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। পানিতে ভাসছে নানা রঙে সাজানো সাতটি জাহাজ। বাঁশ, কাঠ, বেত ও রঙিন কাগজের কারুকাজে জাহাজগুলোতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জাদি, হাঁস, ময়ূর, হাতিসহ বিভিন্ন প্রাণীর অবয়ব। নির্মাণশৈলী ও নকশার বৈচিত্র্যে প্রতিটি জাহাজই যেন আলাদা সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয়েছে। জাহাজগুলো নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাওয়ার সময় তাতে থাকা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কেউ নাচছেন, কেউ গাইছেন, আবার কেউ ঢোল, কাঁসাসহ নানা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তুলছেন। শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাসও চোখে পড়ার মতো। নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে এসব দৃশ্য উপভোগ করছেন হাজারো মানুষ। আয়োজকেরা জানান, প্রায় ২৫০ বছর ধরে রামু সদরের চেরাংঘাটা এলাকায় এ উৎসবের আয়োজন হয়ে আসছে। চট্টগ্রাম থেকে রামুতে এসেছেন সুস্মিতা বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘নিজ এলাকায় প্রবারণা উদযাপন শেষে কল্পজাহাজ ভাসানোর আনন্দে মেতে উঠতে রামুতে চলে আসি।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন্দনী বড়ুয়া বলেন, ‘কল্পজাহাজ ভাসা আমাদের প্রাণের উৎসব। এ উৎসব বৌদ্ধদের হলেও প্রতিবছর এটি অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলায় পরিণত হয়। বাস্তব পরিস্থিতিই তার প্রমাণ।’ মেরোংলোয়া কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, প্রায় দুইশ বছর আগে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে কল্পজাহাজ ভাসা উৎসবের প্রচলন হয়। দেশটির মুরহন ঘা নামের একটি স্থানে নদীতে মংরাজ ম্রাজংব্রান প্রথম এ উৎসবের আয়োজন করেন বলে তিনি জানান। উৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্য তুলে ধরে প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, ‘মহামতি বুদ্ধ রাজগৃহ থেকে বৈশালী যাওয়ার সময় নাগলোকের অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন নাগেরা বুদ্ধের পূজা করার এই দুর্লভ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। সে সময় নাগলোকের পাঁচশ নাগরাজ তাদের পাঁচশ ঋদ্ধিময় ফণা বুদ্ধসহ পাঁচশ ভিক্ষুসংঘের মাথার ওপর বিস্তার করেছিলেন।’ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব প্রতিবছরই রামুর বাঁকখালী নদীকে ঘিরে তৈরি করে এক বর্ণিল পরিবেশ। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে এ আয়োজন হয়ে উঠেছে সম্প্রীতির এক মিলনমেলা।

কক্সবাজারে বৌদ্ধদের ঐতিহ্যবাহী কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব

কক্সবাজারে বৌদ্ধদের ঐতিহ্যবাহী কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

ফানুস উৎসবের বর্ণিল আয়োজনের পর এবার কল্পজাহাজ ভাসানোর আনন্দে মেতেছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ। বাঁশ, কাঠ, বেত ও রঙিন কাগজে নান্দনিক কারুকাজে তৈরি জাহাজগুলো নৌকায় বসিয়ে ভাসানো হচ্ছে নদীতে। জাহাজে জাহাজে চলছে গান, নাচ ও বৌদ্ধ কীর্তন। নদীর দুই পাড়ে জড়ো হয়েছেন হাজারো দর্শনার্থী। ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি উৎসবটি পরিণত হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলনমেলায়।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে কক্সবাজারের রামু উপজেলার বাঁকখালী নদীর চেরাংঘাটা এলাকায় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরে শুরু হওয়া এ উৎসব বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণে আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে। বৌদ্ধদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে যুগ যুগ ধরে এ নদীতে কল্পজাহাজ ভাসানোর আয়োজন হয়ে আসছে।

কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে রামু উপজেলা সদর পেরিয়ে বাঁকখালী নদীর ঘাট। সোমবার বিকেল ৩টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নদীর দুই পাড়ে মানুষের ভিড়। গান-বাজনা, কীর্তন ও ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে উৎসবে মেতেছেন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ।

পাঁচ থেকে ছয়টি কাঠের নৌকার ওপর বসানো হয়েছে কল্পজাহাজ। এর মধ্যে দুটি জাহাজে ব্যবহার করা হয়েছে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। পানিতে ভাসছে নানা রঙে সাজানো সাতটি জাহাজ। বাঁশ, কাঠ, বেত ও রঙিন কাগজের কারুকাজে জাহাজগুলোতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জাদি, হাঁস, ময়ূর, হাতিসহ বিভিন্ন প্রাণীর অবয়ব। নির্মাণশৈলী ও নকশার বৈচিত্র্যে প্রতিটি জাহাজই যেন আলাদা সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয়েছে।

কক্সবাজারে বৌদ্ধদের ঐতিহ্যবাহী কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব

জাহাজগুলো নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাওয়ার সময় তাতে থাকা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। কেউ নাচছেন, কেউ গাইছেন, আবার কেউ ঢোল, কাঁসাসহ নানা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তুলছেন। শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাসও চোখে পড়ার মতো। নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে এসব দৃশ্য উপভোগ করছেন হাজারো মানুষ।

আয়োজকেরা জানান, প্রায় ২৫০ বছর ধরে রামু সদরের চেরাংঘাটা এলাকায় এ উৎসবের আয়োজন হয়ে আসছে।

চট্টগ্রাম থেকে রামুতে এসেছেন সুস্মিতা বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘নিজ এলাকায় প্রবারণা উদযাপন শেষে কল্পজাহাজ ভাসানোর আনন্দে মেতে উঠতে রামুতে চলে আসি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন্দনী বড়ুয়া বলেন, ‘কল্পজাহাজ ভাসা আমাদের প্রাণের উৎসব। এ উৎসব বৌদ্ধদের হলেও প্রতিবছর এটি অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলায় পরিণত হয়। বাস্তব পরিস্থিতিই তার প্রমাণ।’

কক্সবাজারে বৌদ্ধদের ঐতিহ্যবাহী কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব

মেরোংলোয়া কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, প্রায় দুইশ বছর আগে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে কল্পজাহাজ ভাসা উৎসবের প্রচলন হয়। দেশটির মুরহন ঘা নামের একটি স্থানে নদীতে মংরাজ ম্রাজংব্রান প্রথম এ উৎসবের আয়োজন করেন বলে তিনি জানান।

উৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্য তুলে ধরে প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, ‘মহামতি বুদ্ধ রাজগৃহ থেকে বৈশালী যাওয়ার সময় নাগলোকের অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন নাগেরা বুদ্ধের পূজা করার এই দুর্লভ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। সে সময় নাগলোকের পাঁচশ নাগরাজ তাদের পাঁচশ ঋদ্ধিময় ফণা বুদ্ধসহ পাঁচশ ভিক্ষুসংঘের মাথার ওপর বিস্তার করেছিলেন।’

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কল্পজাহাজ ভাসা উৎসব প্রতিবছরই রামুর বাঁকখালী নদীকে ঘিরে তৈরি করে এক বর্ণিল পরিবেশ। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে এ আয়োজন হয়ে উঠেছে সম্প্রীতির এক মিলনমেলা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed