রাখাইনে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বেড়েই চলেছে, ‘নো-ফ্লাই জোন’ ঘোষণার দাবি

রাখাইনে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বেড়েই চলেছে, ‘নো-ফ্লাই জোন’ ঘোষণার দাবি

রাখাইনে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বেড়েই চলেছে, ‘নো-ফ্লাই জোন’ ঘোষণার দাবি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় রাজ্যটির আকাশসীমায় ‘নো-ফ্লাই জোন’ বা বিমান চলাচল নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণার জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে রাখাইনের নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ব্যস্ত একটি বাজারে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত হওয়ার পর থেকে এক মাসে রাখাইনের বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনায় একের পর এক হামলা চালানো হয়েছে। ওই হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক নিন্দার ঝড় ওঠে।

রাখাইনের ৭০টি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ছাতাসংগঠন ‘আরাকান সিভিল সোসাইটি চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশনস’ (এসিএসও) অবিলম্বে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ান, বিভিন্ন দেশের সরকার এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর প্রতি জরুরি আহ্বান জানিয়েছে।

সংগঠনটি শুধু নো-ফ্লাই জোন ঘোষণার দাবিই জানায়নি, জান্তা বাহিনীর বিমান হামলা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি, অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের সরবরাহ বন্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও দাবি জানিয়েছে।

বাজারে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর রাখাইনের বেসামরিক এলাকায় প্রাণঘাতী বিমান হামলা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ আহ্বান জানানো হয়েছে।

এসিএসওর একজন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতীকে বলেন, “কিয়াউকতাওয়ে বিমান হামলায় শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের হত্যার ঘটনা আমাদের স্থানীয় মানবিক সহায়তাকর্মীরা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন।” এ অভিজ্ঞতাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানানোর পেছনে অন্যতম কারণ বলে জানান তিনি।

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানান, গত ছয় মাসে রাখাইনজুড়ে জান্তা বাহিনী ৬০০টিরও বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল বাজার, বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবির ও বৌদ্ধবিহার। থান্ডওয়ে, পোনাগিউন, ম্রাউক-ইউ ও সিত্তে শহরের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী চিন রাজ্যের পালেতোয়া টাউনশিপেও এসব হামলা চালানো হয়েছে।

সামরিক বাহিনী থেকে বেরিয়ে আসা সদস্যদের প্রতিষ্ঠিত গবেষণা সংস্থা ‘মিয়ানমার ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট’-এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই রাখাইনে ১৩৬টি বিমান হামলা চালিয়েছে জান্তা বাহিনী। এসব হামলায় ১৪৪ জন বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬২ জন নিহত এবং ৮২ জন আহত হয়েছেন। ওই মাসে মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় রাখাইনেই বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সাগাইং অঞ্চলে ১০১ জন এবং ম্যাগওয়ে অঞ্চলে ৬১ জন বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন।

এসিএসও যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইনে চরম দুর্ভোগের মধ্যে থাকা বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে সরাসরি খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সীমান্তপথে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চালুর আহ্বান জানিয়েছে।

পাশাপাশি জাতিসংঘের ‘ইন্ডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার’কে (আইআইএমএম) মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করার এবং দায়ীদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার আওতায় জবাবদিহির মুখোমুখি করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

২০২৩-২৪ সালে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে অভিযানের সময় জাতিগত আরাকান আর্মি (এএ) রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টি এবং চিন রাজ্যের পালেতোয়া টাউনশিপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে রাজ্যটিতে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলা আরও বেড়েছে। বর্তমানে রাজ্যের রাজধানী সিত্তে এবং চীন-সমর্থিত সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল থাকা কিয়াউকফিউয়ের আশপাশে তীব্র লড়াই চলছে। রাখাইনে জান্তা বাহিনীর সর্বশেষ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলো দখলে নিতে আরাকান আর্মি অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

এদিকে মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক নিন্দা প্রস্তাব আটকে দিয়েছে জান্তা সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন, রাশিয়া ও বেলারুশ।

গত এপ্রিলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত একটি নির্বাচনের পর নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন অভ্যুত্থানকারী নেতা মিন অং হ্লাইং। এরপর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈধতা আদায়ের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছেন তিনি। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চীন, রাশিয়া, বেলারুশ, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া ও ভারত সফর করেছেন।

তবে সমালোচকদের মতে, জান্তা সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের এই উষ্ণতা এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করছে, যে সরকার নিজ দেশের জনগণকে দমনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে চলেছে।

এসিএসওর ওই কর্মকর্তা বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রতি এভাবে চোখ বন্ধ করে রাখে, তাহলে আমাদের এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না যে তাদের মধ্যে মানুষের কষ্টের প্রতি কোনো সহমর্মিতা নেই।”

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *