দালাল চক্রের মাধ্যমে সীমান্তের ১৬ পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গারা

দালাল চক্রের মাধ্যমে সীমান্তের ১৬ পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গারা

দালাল চক্রের মাধ্যমে সীমান্তের ১৬ পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গারা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

রোহিঙ্গা সংকটে জর্জরিত বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে নানা চেষ্টা করেও মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে তাদের দেশে এখনও ফেরত পাঠাতে পারেনি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবস্থা নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তারা নতুন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ রুখতে সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। সীমান্তে বাড়ানো হয়েছে টহল ও নজরদারি। তার পরও একশ্রেণির দালালের সহায়তায় সীমান্তের ১৬টি পয়েন্ট দিয়ে বেশ কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে। গত কয়েক সপ্তাহে রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথাও হয়েছে দেশের প্রথমসারির গণমাধ্যম সমকালের।

নাফ নদে রোহিঙ্গা পাচারে দালাল চক্র গড়ে উঠেছে বলে স্বীকারও করেছেন টেকনাফ নৌ পুলিশের ইনচার্জ পরিদর্শক তপন কুমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারে চলমান যুদ্ধের সুযোগে কিছু দালাল চক্রের রোহিঙ্গা পারাপারের বাণিজ্য গড়ে তোলার খবর আমরা শুনেছি। আমরা সেসব দালালকে শনাক্তে কাজ করছি। এ ছাড়া নাফ নদ দিয়ে যাতে কোনো অনুপ্রবেশের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য আমরা টহল অব্যাহত রেখেছি। আমাদের জনবল সংকটের পাশপাশি নৌযান না থাকায় আমরা যখন-তখন অভিযানে নামতে পারি না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দালালরা ২০ হাজার থেকে লাখ টাকার বিনিময়ে উখিয়া-টেকনাফের সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে রোহিঙ্গাদের এ দিশে নিয়ে আসে। এ কাজে যুক্ত অন্তত ২০ জনের বেশি দালালের নাম পাওয়া গেছে। তাদের মধ্য রয়েছে– টেকনাফের বদি আলম, হেলাল উদ্দিন, রহিম বাদশা, মো. বলি, নুর মোহাম্মদ, মোহাম্মদ সালমান, শামসুল আলম, মো. জাবেদ, ইমান হোসেন ইউচুপ, মো. ইউনুছ, মো. সিরাজ, আজিজ উল্লাহ, জাফর আলম, মো. জিয়াবুল, মো. শফিক, মুহাম্মদ মান্নান, করিম উল্লাহ, নজির আহমেদ, মো. শফিক, মো. ফারুক, মো. জয়নাল, নুর হোসেন ও মো. সাদ্দাম। এ ছাড়া আরও কিছু ব্যক্তি রোহিঙ্গা পাচারে জড়িত। পুলিশের তালিকায় মানব পাচারে জড়িতদের সবারই নাম রয়েছে। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আছে মামলাও।

দালালরা সীমান্তে অন্তত ১৬টি পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসছে। পয়েন্টগুলো হলো– বান্দারবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, তুমব্রু, ঘুমধুম, টেকনাফ সীমান্তের জাদিমুড়া, কেরুনতরী, বরইতলী, নাইট্যং, চৌধুরীপাড়া, মৌলভীপাড়া, নাজিরপাড়া, নয়াপাড়া, মেরিন ড্রাইভের খুরের মুখ, মহেষখালীয়াপাড়া, তুলাতুলি ঘাট ও জালিয়াপাড়া ও গোলারচর।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্তের এই পরিস্থিতিতে অনুপ্রবেশে মধ্যস্থতাকারীদের যেন আবির্ভাব না ঘটে, সে জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অনুপ্রবেশ রুখতে কাজ করছি। যদি এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে, আমরা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করব।’

রোহিঙ্গার বয়ানে মিয়ানমারের পরিস্থিতি

সম্প্রতি শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এক স্বজনের সঙ্গে একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন মিয়ানমারের মোহাম্মদ সাজে। তিনি জানান, মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে নৌকায় আরও ১২ জন রোহিঙ্গার সঙ্গে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এই রোহিঙ্গা তরুণ বলেন, ‘আমার বাড়ি রাখাইনের বুথিডং। সেখানে যুদ্ধে সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার বাবা মর্টার শেলের আঘাতে নিহত হয়েছেন। কিছু খাবার নিয়ে আমরা গ্রাম ছেড়ে আসি। ৬০ যুবক আরাকান আর্মির হাতে ধরা পড়েছিল। আমি জানি না তাদের পরিণতি কী হয়েছে। দালাল মোহাম্মদ ইউনুসের মাধ্যমে প্রত্যেকে চার লাখ কিয়াট দিয়ে পালিয়ে আসি।’

টেকনাফ সীমান্তে বিজিবির টহলের কারণে দুই দিন তাঁকে নৌকায় ভাসতে হয়েছে জানিয়ে সাজে বলেন, ‘প্রবল বর্ষণের মধ্যে এক রাতে আমরা গোলারচর এলাকা দিয়ে শাহপরীর দ্বীপে প্রবেশ করি। সে সময় তিনজন দালাল ছিল।’

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া আরেক রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘আমরা দুই ভাই তিন দিন পাহাড়ি এলাকায় হেঁটে নদী পার হয়েছি। এই যাত্রায় আমাদের সঙ্গে অন্যান্য গ্রামের আরও সাতজন ছিলেন। যেহেতু আমাদের দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে, তাই কেউ এখানে (বাংলাদেশ) ঢুকেছে, আবার কেউ দালালের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেছে।’

এদিকে, গত ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত টেকনাফের জেলেদের নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তার পরও সাগরে মাছ ধরার নৌকা দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ আছে, মাছ ধরার নামে কৌশলে ওই নৌকায় একশ্রেণির দালাল টাকার বিনিময়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের এ দেশে নিয়ে আসছে।

কোস্টগার্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, ইতোমধ্যে কোনো রোহিঙ্গা ঢুকেছে কিনা, তা জানি না। দালালদের দৌরাত্ম্য বিষয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকানোর পাশাপাশি যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাহিনীর সদস্যরা প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিজিবি টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *