সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় বান্দরবানে চিত্রশিল্পী খিং সাই মং মারমার একক চিত্র প্রদর্শনী
![]()
নিউজ ডেস্ক
ঝিরি-ঝরনার পাথর ও জীবন্ত ব্যাঙ দাঁড়িপাল্লায় ঝুলছে। বিক্রি হচ্ছে কেজি দরে। প্রাণ-প্রকৃতি যেন পণ্যে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ের নিসর্গ ও পাহাড়ি মানুষের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে আঁকা এই ছবির সামনে দর্শকেরা মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ান। শিল্পী খিং সাই মং মারমার আঁকা ছবিটি যেন পাহাড়ের প্রাণ-প্রকৃতির দীর্ঘশ্বাস।
বান্দরবান জেলা শহরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে (কেএসআই) খিং সাই মং মারমার একক চিত্র প্রদর্শনীর শেষ দিন ছিল গতকাল সোমবার (২২ ডিসেম্বর)। সেনাবাহিনীর ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড ও বান্দরবান রিজিয়নের পৃষ্ঠপোষকতায় চার দিনব্যাপী এই প্রদর্শনী শুরু হয় ১৯ ডিসেম্বর। ‘রোয়া-দ্ব’ নামের এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে শিল্পীর জলরং ও তেলরঙে আঁকা ২৭টি ছবি।

প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম রাকিব ইবনে রেজওয়ান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনীর সদর জোনের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মো: হুমায়ুন রশিদ, পুলিশ সুপার মো: আবদুর রহমানসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।
শিল্পী খিং সাই মং মারমা প্রতিটি ছবিতে বান্দরবানের প্রাকৃতিক ও জাতিতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের ছোঁয়া যেমন রয়েছে, তেমনি উঠে এসেছে হারানো সময়ের চালচিত্র। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ঐতিহ্যের শিকড়সন্ধানী শিল্পীর মনোভাবে পরিচয় মেলে প্রদর্শনীর নামকরণেও। ‘রোয়া-দ্ব’ নামে আয়োজিত এই প্রদর্শনী বান্দরবানের অতীতের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। মারমা ভাষায় ‘রোয়া-দ্ব’ বলতে বান্দরবানকে বোঝায়। আরও পরিষ্কার করে বললে, ‘রোয়া-দ্ব’ হলো বোমাং সার্কেলের কেন্দ্রীয় গ্রাম বা রাজধানী।

শিল্পীর বেশ কয়েকটি ছবির শিরোনাম ‘অস্তিত্ব’। এই সিরিজের একটি ছবিতে দেখা যায়, কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল, কুকুরের পাশ ঘেঁষে বসে থাকা কয়েকটি পাহাড়ি শিশু শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে উড়ন্ত পালকের দিকে। ছবিটি দর্শককে আচ্ছন্ন করে। আক্রান্ত করে। পাহাড়ের বাস্তবতা ও তার অনিশ্চয়তার দিকে টেনে নিয়ে যায়।
‘পাথর’ শিরোনামে একটি ছবিতে দেখা যায়, ঝিরি-ঝরনার পাথর দাঁড়িপাল্লায় তোলা হয়েছে, তার নিচে একটি কাঁকড়া। কোটি বছর ধরে বালুকণা জমে সৃষ্ট পাথর বিক্রি হচ্ছে, অপর দিকে এই পাথর যার আবাস, সেই কাঁকড়ার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠছে।
শিল্পী খিং সাই মং মারমার ছবিতে হাইপাররিয়েলিজম অর্থাৎ অতিবাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার মেলবন্ধন ঘটেছে। ফটোগ্রাফির নিখুঁত ডিটেইল পাওয়া যায় তাঁর ছবিতে। একই সঙ্গে পরিপার্শ্বকে বদলে দেওয়া নতুন বাস্তবতাও আবিষ্কার করে দর্শক।

প্রকৃতিঘনিষ্ঠ ১১টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবনের প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে খিং সাইয়ের ছবিতে।
শিল্পী খিংসাই মং মারমা জানান, ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি গভীর নেশা ছিল তার। এই নেশার ধারাবাহিকতায় পরে তিনি চারুকলার শিক্ষার্থী হয়ে বহু গুণী শিল্পীর সান্নিধ্যে আসেন। ঢাকা সহ বিভিন্ন জায়গায় যৌথভাবে তার চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হলেও বান্দরবানে এটি তার প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী। প্রথম দিনেই প্রদর্শনীতে বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শক ছুটে এসে চিত্রকর্ম উপভোগ করেন এবং পাহাড়ের প্রকৃতি ও জীবনধারার প্রতি তাদের মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানে রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম রাকিব ইবনে রেজওয়ান বলেন, শিল্পী খিং সাই মং মারমার এই প্রদর্শনী দেখে আরও অনেকে অনুপ্রাণিত হবেন। তাঁর ছবি ভবিষ্যতে পাহাড়কে আলোকিত করবে।
উল্লেখ্য, প্রদর্শনীর মাধ্যমে খিংসাই মারমা পাহাড়ের সৌন্দর্য এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিতি ঘটানোর পাশাপাশি পরিবেশের সুরক্ষা এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। এই উদ্যোগ স্থানীয় সম্প্রদায় ও শিল্পপ্রেমীদের মধ্যে প্রশংসিত হয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।