নিরাপত্তা অভিযানের মধ্যেই মানবিক উদ্যোগ: দুর্গম কালাপাহাড় রেঞ্জে সেনাবাহিনীর বিশুদ্ধ পানির প্রকল্প
![]()
নিউজ ডেস্ক
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম জনপদে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নিরাপত্তাজনিত অস্থিতিশীলতার মধ্যে বসবাসকারী মানুষের জন্য স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি মানবিক উদ্যোগ। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার লক্ষীছড়ি উপজেলার কালাপাহাড় রেঞ্জের চারটি দুর্গম পাড়ায় স্থায়ী বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করেছে সেনাবাহিনীর লক্ষীছড়ি জোন, যেখানে বছরের পর বছর ধরে নিরাপদ পানির তীব্র সংকটে দিন কাটাচ্ছিল স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কয়েক হাজার মানুষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দ্বারা গুইমারার রামসু বাজার এলাকায় গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৮ অক্টোবর থেকে ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান শুরু হয়। অভিযানের অংশ হিসেবে বর্মাছড়িতে অস্থায়ী পেট্রোল বেস স্থাপনকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র গোষ্ঠী পুনরায় অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা চালালেও নিরাপত্তা বাহিনী দৃঢ় অবস্থানে থেকে অভিযানিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখে, যা এখনো চলমান রয়েছে।

অভিযানের মধ্যেই উঠে আসে পানির সংকটের বাস্তব চিত্র
নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনার সময় সেনা সদস্যরা কালাপাহাড় রেঞ্জের দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্র প্রত্যক্ষ করেন। দেখা যায়, স্থানীয় জনগণ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে পাহাড়ি ঝিরি ও ঝর্ণার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে পানি সংগ্রহ করতে নারী ও শিশুদের প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে এই সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে সেনাবাহিনীর লক্ষীছড়ি জোন কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় সীমাবদ্ধ না থেকে তাৎক্ষণিকভাবে মানবিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় একটি স্থায়ী বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২৪ পদাতিক ডিভিশনের উদ্যোগে বৃহৎ পানি প্রকল্প
সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের উদ্যোগে এবং ২৪ আর্টিলারি ব্রিগেড ও গুইমারা রিজিয়নের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় গত ৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ থেকে কালাপাহাড় রেঞ্জে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির আওতায় হাতিছড়া পাড়া, ইন্দ্রসিংপাড়া, শুকনাছড়ি ও পাঙ্কু পাড়া—এই চারটি দুর্গম পাড়াকে একীভূত করে নিরাপদ পানির স্থায়ী সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।

গুইমারা রিজিয়নের অধীন লক্ষীছড়ি জোনের সেনা সদস্যরা প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় সকল প্রতিকূলতা দূর করে পাইপলাইন স্থাপন, রিজার্ভ ট্যাংক নির্মাণসহ সকল প্রযুক্তিগত ও শারীরিক শ্রমসাপেক্ষ কাজ নিজেরাই সম্পন্ন করেন। দুর্গম পাহাড়ি পথ, ঘন বনাঞ্চল এবং প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশের মধ্যেও সেনা সদস্যদের দক্ষতা, নিপুণতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২২ হাজার ২০০ ফিট (প্রায় ৭ কিলোমিটার) দীর্ঘ পানি সরবরাহ লাইন স্থাপন করা হয়েছে এবং মোট ৮টি পানির রিজার্ভ ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২০ লাখ টাকা।

প্রকল্পটি সম্পন্ন হওয়ায় চারটি দুর্গম পাড়ার মোট ৩৭৬টি পরিবার—অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৭৫০ জন মানুষ প্রথমবারের মতো নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী সুবিধা পাচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, এই উদ্যোগ তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় মৌলিক পরিবর্তন এনে দেবে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।
সশস্ত্র প্রভাবের মধ্যে থেকেও উন্নয়নের বার্তা
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ইউপিডিএফের দীর্ঘদিনের সন্ত্রাসী প্রভাব ও চাপের কারণে এই অঞ্চলের জনগণ নিয়মিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিল। এমন প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর এই মানবিক উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি করেছে।
সেনাবাহিনীর লক্ষীছড়ি জোন অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে কেবল সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাই নয়, বরং স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সমন্বিত প্রচেষ্টা
অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অঞ্চল হলেও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এই সম্ভাবনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযান এবং একইসঙ্গে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম প্রমাণ করছে, রাষ্ট্র এই অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সমন্বিত কৌশলে এগোচ্ছে।
সেনাবাহিনী সূত্রে জানানো হয়েছে, এ ধরনের মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনধারা ফিরিয়ে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।