খাগড়াছড়ি আসনে নির্বাচনী সমীকরণ: বড় ফ্যাক্টর অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠনের ‘ভোট ব্যাংক’

খাগড়াছড়ি আসনে নির্বাচনী সমীকরণ: বড় ফ্যাক্টর অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠনের ‘ভোট ব্যাংক’

খাগড়াছড়ি আসনে নির্বাচনী সমীকরণ: বড় ফ্যাক্টর অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠনের ‘ভোট ব্যাংক’
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি (২৯৮) আসনে জয়–পরাজয়ের সমীকরণে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে পাহাড়ের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর তথাকথিত ‘ভোট ব্যাংক’। মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রত্যন্ত এলাকার ভোটারদের সংগঠিত সমর্থন এবার জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অতীত নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, খাগড়াছড়ি আসনে আওয়ামী লীগ পাঁচবার, বিএনপি দুইবার এবং জাতীয় পার্টি একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আঞ্চলিক দল বা আঞ্চলিক সংগঠন-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী জাতীয় সংসদে যেতে পারেননি। এবার সেই দীর্ঘদিনের অপূর্ণতা পূরণে একক অবস্থানে আসার চেষ্টা করছে পাহাড়ের প্রভাবশালী অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠনগুলো।

নির্বাচনী আচরণ বিধি অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু না হলেও বিভিন্ন কৌশলে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। এখন পর্যন্ত ভোটের মাঠে তুলনামূলকভাবে শান্ত ও সুষ্ঠু পরিবেশ বিরাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

পার্বত্য তিন জেলার মধ্যে খাগড়াছড়ি আসনেই ভোটার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন—সব ক্ষেত্রেই এই আসনে জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব লক্ষণীয়। জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক নানা হিসাব-নিকাশ বরাবরের মতো এবারও ভোটের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচনে আঞ্চলিক সংগঠনসমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একাধিকবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই সাফল্য না আসার আক্ষেপ থেকেই এবারের নির্বাচনে কয়েকটি অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে।

বিশেষ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর দুই গ্রুপ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সংগঠন একক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দীঘিনালা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ধর্মজ্যোতি চাকমার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে।

মনোনয়ন বাতিল হওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী লাব্রেচাই মারমা বলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের বৃহত্তর স্বার্থে নাগরিক সমাজ ধর্মজ্যোতি চাকমাকে সমর্থন দেওয়ায় তিনি মনোনয়ন বাতিলের পর আপিল করেননি। একক প্রার্থীর পক্ষে পাহাড়ে ব্যাপক সমর্থন রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-এম এন লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুদর্শন চাকমা বলেন, জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো সরকারে যাওয়ার আগে এক রকম প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় গিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করেছে। ফলে জাতীয় দলগুলোর প্রতি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এবার জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে জাতীয় দলগুলোর প্রার্থীরাও আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এয়াকুব আলী বলেন, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই তিনি মাঠে কাজ করছেন। পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন বলে দাবি করে তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিজয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

বিএনপির প্রার্থী ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, অতীতে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পাহাড়ি ও বাঙালি সব সম্প্রদায়ের উন্নয়নে কাজ করেছেন। বিগত সরকারের মেয়াদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না পেলেও এবারের নির্বাচনে মাঠে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করছেন। নির্বাচিত হলে বৈষম্যহীন উন্নয়নের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করার অঙ্গীকার করেন তিনি।

জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, খাগড়াছড়ি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন। এ আসনে বৈধ প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির ওয়াদুদ ভূঁইয়া, জামায়াতে ইসলামীর এয়াকুব আলী, জাতীয় পার্টির মিথিলা রোয়াজা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা কাউছার আজিজী, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির ঊশেপ্রু মারমা, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. নুর ইসলাম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ধর্মজ্যোতি চাকমা।

উল্লেখ্য, এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন মোট ১৫ জন প্রার্থী। যাচাই-বাছাই শেষে গত ৩ জানুয়ারি রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত সাতজন প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করেন এবং বিভিন্ন ত্রুটির কারণে আটজনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়।

সব মিলিয়ে, খাগড়াছড়ি আসনে এবার জাতীয় দল বনাম আঞ্চলিক সমর্থননির্ভর স্বতন্ত্র প্রার্থীর লড়াই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *