মুসলিমরা যেন আসাম ছেড়ে যায়, হেনস্তার উসকানি হিমন্ত বিশ্বশর্মার
![]()
নিউজ ডেস্ক
গত কয়েকদিন ধরেই হিমন্ত বিশ্বশর্মা মিঞাঁ মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন উক্তি করছেন। তার অবস্থান যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে, তা নিয়ে কোনো লুকোছাপা নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আসামে কয়েক মাসের মধ্যেই বিধানসভা নির্বাচন হবে এবং এখন সেখানে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের কাজ চলছে। এই সংশোধন পশ্চিমবঙ্গসহ আরও অনেক রাজ্যে যে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন চলছে, তা থেকে পৃথক। আসামের এই তালিকা সংশোধন একরকম ভোটের আগে রুটিন প্রক্রিয়া।
ভোটার তালিকায় কারও নাম নিয়ে যে কেউই ‘সাত নম্বর ফর্ম’ জমা দিয়ে আপত্তি তুলতে পারেন।
আপত্তি তোলার জন্য গুচ্ছ গুচ্ছ ‘সাত নম্বর ফর্ম’ জমা দেওয়ার নির্দেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে বৃহস্পতিবার চিঠি পাঠিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন আসামের কংগ্রেস নেতৃত্ব।
মুসলামানদের উত্যক্ত করতে চাইছেন হিমন্ত?
আসামের মুখ্যমন্ত্রী আগেও মিঞাঁ মুসলমানদের নিয়ে নানা কথা বললেও গত মঙ্গলবার থেকে তিনি বারবার এই প্রসঙ্গ তুলছেন।
তিনসুকিয়া জেলার ডিগবয়তে একটি অনুষ্ঠানের পরে সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন, “আমাদের কাছে ভোট চুরি মানে আমরা কিছু মিঞাঁ ভোট চুরি করতে চাইছি। আদর্শ ব্যবস্থা সেটাই হতো যদি তাদের আসামে ভোট দেওয়ার অনুমতি না দিয়ে বাংলাদেশে দেওয়া হতো।“
আমরা নিশ্চিত করছি, যাতে তারা আসামে ভোট না দিতে পারে, এমন মন্তব্য করেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা।
জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এটা (বিশেষ সংশোধন) তো প্রাথমিক। যখন এসআইআর (নিবিড় সংশোধন) হবে আসামে, চার থেকে পাঁচ লাখ মিঞাঁ নাম আসাম থেকে কাটা যাবে। কংগ্রেস যত পারে আমাকে গালাগালি করুক। আমার কাজ হলো যাতে মিঞাঁ মানুষদের ভোগান্তি হয়।”
এর আগেও তিনি বলেছিলেন, তার সরকার আইনের আওতার মধ্যে থেকেই মিঞাঁদের উত্যক্ত করবে।
সেদিনই অন্য একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী মিঞাঁদের এখানে ভোট দেওয়ার কথা নয়, তাদের উচিত বাংলাদেশে ভোট দেওয়া। তারা যাতে আসামে ভোট দিতে না পারে, সে ব্যাপারে আমরা কিছু ব্যবস্থা নিয়েছি।”
সাধারণ মানুষকেও তিনি বলেছিলেন, যাতে তারাও মিঞাঁদের বিরক্ত করতে থাকেন। তার কথায়, “মিঞাঁদের উত্যক্ত করা দরকার। যদি রিকশার ভাড়া পাঁচ টাকা হয়, তাহলে চার টাকা দিন যাতে তাদের বিরক্ত করা হয়। এভাবেই তারা এখান থেকে চলে যাবে।”
ভোটার তালিকায় থাকা মিঞাঁ মুসলমানদের নাম নিয়ে আপত্তি তুলে তার দলের কর্মীরা যে পাঁচ লাখেরও বেশি ‘সাত নম্বর ফর্ম’ জমা দিয়েছেন, সেটাও একাধিকবার বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বুধবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আসামের সবাই জানে যে বাংলাদেশি মিঞাঁ অনুপ্রবেশকারীরা রাজ্যে এসেছে। যদি ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধনের সময়ে তারা কেউ নোটিশ না পায় তাহলে তার অর্থ কী দাঁড়ায়? যে আসামে কোনো বিদেশি নাগরিক নেই।”
“এজন্যই আমাদের কর্মীরা পাঁচ লাখেরও বেশি ফর্ম জমা দিয়ে আপত্তি তুলেছে। নাহলে তো সকলেই আইনি বৈধতা পেয়ে যাবে,” মন্তব্য হিমন্ত বিশ্বশর্মার।
তার মন্তব্য নিয়ে সমালোচনা শুরু হওয়ায় বৃহস্পতিবার তিনি বলেছেন, ‘মিঞাঁ’ শব্দটি তো তার আবিষ্কার নয়, বাংলাদেশি মুসলমানরা নিজেরাই মিঞাঁ পরিচয় দেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়ে তিনি বলেন, “আমি তো মুসলমান শব্দটা ব্যবহার করছি না, তাতে আমাদের ভূমিপুত্র মুসলমান বাসিন্দাদের আঘাত লাগতে পারে।”
ঘটনাচক্রে ঢাকায় আসামের যে মুসলমান নারী সাকিনা বেগমকে খুঁজে পেয়েছিল বিবিসি বাংলা, তিনি কিন্তু বাংলাভাষী মুসলমান নন, আসামেরই আদি বাসিন্দা তার পরিবার। তাকেও বিশ্বশর্মার সরকার সীমান্ত পার করে দিয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ চেয়েছে কংগ্রেস
ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধনের সময়ে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে বিজেপি কর্মীরা যেভাবে লাখ লাখ আপত্তি জানানোর ফর্ম জমা দিচ্ছেন, তা নিয়ে বিরোধী দলগুলি সমালোচনা করে বলছে, সম্প্রদায়কে টার্গেট করে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।
আসামের বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়া ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের অপব্যবহার নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নজর দেওয়ার অনুরোধ করে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে একটি চিঠি লিখেছেন।
শইকিয়া লিখেছেন, “গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময়ে বার বার নির্দিষ্টভাবে আসামে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধন চলাকালীন শুধুমাত্র (বাংলাভাষী মুসলমান) মিঞাঁ সম্প্রদায়কে ইচ্ছাকৃত-ভাবে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে, যাতে ‘তাদের চাপে রাখা যায়’, ‘তাদের ভোগান্তি হয়’, এবং এটা দেখানো যায় যে, আসামে একটা ‘প্রতিরোধ’ হচ্ছে।”
দেবব্রত শইকিয়া তার চিঠিতে আরও লিখেছেন, “মুখ্যমন্ত্রী সর্বসমক্ষে যেভাবে শুধুই ‘মিঞাঁদের’ নোটিশ দেওয়া হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য হলো ‘তাদের যাতে ভোগান্তি হয়’ বা ‘চার থেকে পাঁচ লক্ষ মিঞাঁ ভোট বাদ যায়’ এবং সরকার ‘মিঞাঁ ভোট চুরি করার চেষ্টা চালাচ্ছে’—এ ধরনের বক্তব্যগুলো সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে ভোটারদের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অভিপ্রায়ের নজিরবিহীন স্বীকারোক্তি।”
অন্যদিকে গুয়াহাটি হাইকোর্টে বুধবার একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে, যাতে আসামের ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনে ব্যাপক হারে আপত্তি তোলার ঘটনায় আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
কংগ্রেস, রাইজর দল, আসাম জাতীয় পরিষদ, সিপিআইএম যৌথভাবে এ নিয়ে আসামের মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপিও জমা দিয়েছে।
রাইজর দলের সভাপতি ও বিধায়ক অখিল গগৈ বলছেন যে, আসামের মানুষ তো মিঞাঁদের চাপের রাখার জন্য হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে মুখ্যমন্ত্রী বানায়নি।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।