ভোটের নাশকতায় রোহিঙ্গাদের ব্যবহারের শঙ্কা, সতর্ক ইসি
![]()
নিউজ ডেস্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে কক্সবাজারসহ সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় স্বার্থান্বেষী মহল নাশকতা সৃষ্টি করতে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে থেকে আগে থেকেই ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের বহির্গমন সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা, চেকপোস্টে শতভাগ পরিচয় যাচাই ও তল্লাশি জোরদার করাসহ একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে নির্বাচনকালীন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে রোহিঙ্গাদের বিরত রাখতে সশস্ত্র বাহিনীসহ সকল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে পাঠানো চিঠিতে ইসি জানায়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে নির্বাচনকালীন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে রোহিঙ্গাদের বিরত রাখার জন্য উখিয়া-টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পসমূহের নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। ইসির সিদ্ধান্ত অনুসারে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে নির্বাচনকালীন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে রোহিঙ্গাদের বিরত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে।
নির্বাচনে রোহিঙ্গাদের দ্বারা কি ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে- জানতে চাইলে সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিভিন্ন সশস্ত্র দল ও অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। নির্বাচনের সময়ে স্বার্থান্বেষী মহল এসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া, কিছু রোহিঙ্গা অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকায় ভোট প্রদান বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের চেষ্টা করতে পারে। এসব কারণে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসমূহে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নির্বাচনি পরিবেশ বিঘ্নের আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য আমরা আগে থেকেই রোহিঙ্গা ঠেকাতে ইতোমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছি।
ইসি সূত্র জানায়, নির্বাচনে রোহিঙ্গাদের দ্বারা সৃষ্ট যেসব ঝুঁকির তথ্য আমরা পেয়েছি তার মধ্যে রয়েছে— নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অবৈধ হস্তক্ষেপের আশঙ্কা, আসন্ন নির্বাচনে এমপি প্রার্থীদের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের স্থানীয় প্রচারণা, ভোটকেন্দ্রে লোকবল হিসেবে ব্যবহার, টাকার বিনিময়ে জাল ভোট দেওয়া এবং বিরোধী প্রার্থী দমনের ঝুঁকি। এছাড়া ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলও বড় ঝুঁকি। সিআইসি আউটপাস বা অবৈধভাবে কাঁটাতার অতিক্রম করে উখিয়া-টেকনাফের লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়লে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এমন তথ্য আমাদের কাছে এসেছে।
এ সূত্র আরও জানায়, তথ্য আদান-প্রদান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঝুঁকি রয়েছে। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে সক্রিয় বিভিন্ন সোশ্যাল গ্রুপ (যেমন RCPR, Ro-FDMN RC, UCR) গুজব বা উসকানিমূলক বার্তা ছড়িয়ে ক্যাম্পের পরিবেশ অস্থিতিশীল করতে পারে। এছাড়া আরসা (ARSA), আরএসও (RSO) ও আরাকান আর্মির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নির্বাচনের সময়ে সীমান্ত এলাকায় সংঘর্ষে জড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে।
নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে- নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ ঢাকা মেইলকে বলেন, আরপিও পরিবর্তন করে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে তারা সমস্ত বাহিনী মাঠে থাকবেন এবং দেশব্যাপী তাদের বিচরণ থাকবে। এর সঙ্গে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী সাধারণত তাদের পাশে থাকবে। আমরা আশা করি আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ অনেক ভালো হবে এবং এটা সুন্দর নির্বাচনের জন্য সহায়ক হবে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে সে অনুযায়ী কাজ করবে তারা।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেছেন, ভোটের মাঠপর্যায়ে প্রায় ১ লাখের বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন থাকবে। এছাড়া নৌবাহিনীর ৫ হাজার, কোস্ট গার্ডের ৪ হাজার, বিজিবির ৩৭ হাজার, র্যাবের ৯ হাজার, পুলিশের প্রায় দেড় লাখ এবং আনসার বাহিনীর প্রায় ৫ লাখ সদস্য নিয়োজিত থাকবে।
নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই, নির্বাচনের আগে বা পরে কোনো সহিংসতা থাকবে বলেও তিনি জানান।
চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ: নির্বাচনকে সামনে রেখে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের বহির্গমন সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা, এপিবিএনের চেকপোস্টগুলোতে শতভাগ পরিচয় যাচাই ও তল্লাশি জোরদার করা হবে। নির্বাচনের আগের দিন ও ভোটের দিন ক্যাম্পের ভেতরে সিএনজি, অটো ও মোটরবাইকসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
সামাজিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত: নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে থেকে ক্যাম্পে সক্রিয় সব সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ও রোহিঙ্গা সংগঠনের সভা-সমাবেশ বন্ধ রাখার পাশাপাশি রোহিঙ্গারা যেন নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় জড়িত না হয়, সে বিষয়ে মসজিদের ইমাম ও মাঝিদের মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর কথা বলা হয়েছে।
সীমান্ত ও বহিরাগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণ: বিজিবির টহল জোরদার এবং মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর গতিবিধির ওপর বিশেষ নজরদারি, নির্বাচনের সময়ে দেশি-বিদেশি এনজিও কর্মকর্তা ও দর্শনার্থীদের ক্যাম্প পরিদর্শন সীমিত বা নিরুৎসাহিত করা হবে।
স্থানীয় শ্রম ও বাজার ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ: নির্বাচনি প্রচারণার সময় রোহিঙ্গা শ্রমিক নিয়োগ বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত জনসমাগম এড়াতে বালুখালী, লেদা ও নয়াপাড়ার মতো ক্যাম্পসংলগ্ন বড় বাজার নির্বাচনের আগের দিন, ভোটের দিন ও পরদিন সাময়িক বন্ধ রাখা সুপারিশ করা হয়েছে।
মোবাইল কোর্ট ও যৌথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা: ক্যাম্পে পর্যাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন রেখে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচার নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মরিচ্যা, রেজুখাল ও হোয়াইক্যং চেকপোস্টসহ ক্যাম্পের আশপাশে এপিবিএন ও বিজিবির যৌথ নজরদারি জোরদার করা হবে।
এছাড়া রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না করার বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলকে সতর্কবার্তা দেওয়া। একই সঙ্গে এমপি প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা, টাকার বিনিময়ে জাল ভোট বা বিরোধী প্রার্থী দমনে রোহিঙ্গা ব্যবহারের ঝুঁকি ঠেকাতে এপিবিএন ও সিআইসি’র সমন্বয়ে ক্যাম্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও বিশেষ নজরদারি: নির্বাচনের আগে ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ অভিযান পরিচালনা, নির্বাচন কেন্দ্রগামী পথে চেকপোস্ট স্থাপন এবং রোহিঙ্গাদের ভোট প্রদান ঠেকাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পে সিআইসি ও এপিবিএন সদস্যদের নির্বাচনকালীন ক্যাম্পের বাইরে দায়িত্ব না দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
ক্যাম্প অবকাঠামো ও বিদেশি চলাচল: রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সীমানা প্রাচীর ও সিসি ক্যামেরা মেরামত বিদেশি নাগরিক ও INGO/UN সংস্থার কর্মকর্তাদের ক্যাম্পে অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্গম এলাকা পরিদর্শনে নিরুৎসাহিত করার কথাও বলা হয়েছে।
গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। এর আগেও বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গারা এদেশে এসেছে। সবমিলিয়ে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক কক্সবাজারে অবস্থান করছে। বিশাল এই জনগোষ্ঠী নিয়ে বর্তমানে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। এই রোহিঙ্গারা নানা অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এদেশের নাগরিকদের সঙ্গে মিশে জাতীয় পরিচয়পত্র-এনআইডি পাওয়ার চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে। ইতোমধ্যে অনেক রোহিঙ্গা এনআইডি পেয়েও গেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৩৯ জন ভোটার নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
-ঢাকাপোষ্ট