বছরে বাড়তি নিচ্ছে ছয় হাজার কোটি টাকা, আদানির চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার

বছরে বাড়তি নিচ্ছে ছয় হাজার কোটি টাকা, আদানির চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার

বছরে বাড়তি নিচ্ছে ছয় হাজার কোটি টাকা, আদানির চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা ‘বহুল বিতর্কিত’ চুক্তিটি পর্যালোচনা করছে সরকার। চুক্তির বিভিন্ন অসংগতি ও খুঁটিনাটি বিষয় খতিয়ে দেখতে সচিবালয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক হয় গতকাল বৃহস্পতিবার। দেড় ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকে সরকারের চার মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি পর্যালোচনা ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। আদানির সঙ্গে করা চুক্তিসহ বিগত আওয়ামী লীগের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অসম চুক্তিগুলোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে।

২০১০ সালের বিশেষ আইনের আওতায় স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় রিভিউ কমিটি আদানি পাওয়ার লিমিটেডের (এপিএল) সঙ্গে করা চুক্তিটিকে বিশ্বের নিকৃষ্টতর ও বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী হিসেবে উল্লেখ করে এর শর্ত পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের সুপারিশ করে। জাতীয় কমিটির ওই প্রতিবেদনের সুপারিশ নিয়ে গতকালের বৈঠকে আলোচনা হয় বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। আমার দেশকে তিনি বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের করা চুক্তিগুলো নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আমরা সবেমাত্র দায়িত্ব পেয়েছি। আমরা এক্সপার্টদের নিয়ে বসেছি। আরো আলোচনা হবে।’

শপথ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার সচিবালয়ে প্রথম তার দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেন। ওই দিনই তিনি পবিত্র রমজান, সেচ ও গরমের মৌসুমকে সামনে রেখে জনগণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুশাসন দেন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত একটি প্রতিবেদন দিতে বলেন।

গতকাল বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, চুক্তি পর্যালোচনাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সদস্য ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ মোশতাক হোসেন খান অংশ নেন।

বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আমার দেশকে বলেন, সরকার বিষয়টিকে (আদানির সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে জাতীয় কমিটির সুপারিশ) বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। আমরা আলোচনা করেছি। সামনে আরো কথা হবে।

অর্থনীতিবিদ মোশতাক হোসেন খান আমার দেশকে বলেন, জাতীয় কমিটি একটি সুপারিশ সরকারের কাছে পেশ করেছে। সরকার বিষয়গুলো নিয়ে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করছে।

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, আমরা সবেমাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। আমাদের কাছে জনগণের বিশাল প্রত্যাশা রয়েছে। আমরা চেষ্টা করব জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূল্য দিতে। আদানির সঙ্গে করা চুক্তির বিষয়ে জনস্বার্থ ও আন্তর্জাতিক সব বিধিবিধান দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ বিষয়ে জাতীয় কমিটির সুপারিশও আমাদের কাছে রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আমার দেশকে বলেন, ‘আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশের স্বার্থ। দেশ ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।’

আদানির সঙ্গে আওয়ামী লীগের করা চুক্তি আত্মঘাতী

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় বিপিডিবির সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে আদানির সঙ্গে চুক্তির কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৭ সালের নভেম্বরে শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে এক হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) স্বাক্ষরিত হয়।

২০২৩ সালের এপ্রিলে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। বাংলাদেশে উৎপাদিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের দামের চেয়ে আদানির বিদ্যুতের দাম কম হবে-শুরুতে এমন ঘোষণা দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে তা কয়েকগুণ বেশি। বিপিডিবির তথ্যানুযায়ী, আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম অন্য ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ৮৫ শতাংশের বেশি ব্যয়বহুল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা, যেখানে অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুতের দাম ছিল প্রতি ইউনিট ৮ থেকে ১০ টাকার মধ্যে।

পিডিবি সূত্র জানায়, চুক্তি অনুযায়ী কোনো বিদ্যুৎ না কিনলেও বাংলাদেশকে প্রতি মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে ৪৫০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করতে হচ্ছে। গত দুই অর্থবছরেই বিদ্যুৎ আমদানি বাবদ আদানিকে বিল দেওয়া হয়েছে ২৪ হাজার ৮০ কোটি ৩৯ লাখ টাকার বেশি। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত আদানিকে পরিশোধ করা বিলের পরিমাণ কমপক্ষে ৩০ হাজার কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রেগুলো বসিয়ে রেখে ভারতের আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো কারণে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতি হলে বাংলাদেশকে এর দায় নিতে হবে।

আদানি বছরে বাড়তি নিচ্ছে ছয় হাজার কোটি টাকা

জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম যখন ৪ দশমিক ৪৬ সেন্ট ছিল, তখন আদানির সঙ্গে ৮ দশমিক ৬১ সেন্টে চুক্তি করা হয়। দাম নির্ধারণে এক অদ্ভুত সূচক দেওয়া আছে চুক্তিতে। বাংলাদেশ প্রতি বছর আদানিকে বাড়তি ৫০ কোটি ডলার (ছয় হাজার কোটি টাকা) দিচ্ছে। ২৫ বছর চুক্তির মেয়াদে এক হাজার কোটি ডলার বাড়তি নিয়ে যাবে তারা।

জাতীয় কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে গত ২৬ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, ‘আদানির চুক্তিতে সাংঘাতিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। ভারতের অন্য কোনো উৎস থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ কিনলে যে খরচ হতো, আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ৪-৫ সেন্ট বেশি দিতে হচ্ছে। বর্তমানে ভারতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দামের সঙ্গে তুলনা করলেও এর দাম অনেক বেশি। আদানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল ৮ দশমিক ৬১ সেন্টে। শর্তের মারপ্যাঁচে ২০২৫ সালে পরিশোধ করতে হয়েছে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্ট করে। এতে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বেশি বিল দিচ্ছে আদানিকে। চুক্তি অব্যাহত থাকলে ২৫ বছর ধরে দিয়ে যেতে হবে। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের আমলা বা রাজনীতিবিদের পক্ষে এমন চুক্তি করা সম্ভব নয়।’

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *