‘হাসিনা-কেন্দ্রিকতা ছাপিয়ে ঢাকার সাথে সম্পর্ক ঢেলে সাজানোর মোক্ষম সময়ে ভারত’
![]()
নিউজ ডেস্ক
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিপুল বিজয়কে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন ভারতের লোকসভার সংসদ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর। তার মতে, দীর্ঘদিনের ‘হাসিনা-কেন্দ্রিক’ নীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের এটিই শ্রেষ্ঠ সুযোগ।
প্রখ্যাত কূটনীতিবিদ শশী থারুর সম্প্রতি এনডিটিভিতে একটি নিবন্ধ লিখেছেন, যেখানে তিনি বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন দিগন্ত নিয়ে আলোকপাত করেছেন। ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের এই নেতা তার নিবন্ধে উল্লেখ করেন, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূখণ্ডের একটি বিশাল পরিবর্তন। ২০২৪ সালের ‘মনসুন রেভল্যুশন’ বা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়েছিল, ভোটের মাধ্যমে জনগণ তারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। ৬০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ তাদের রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরে পেয়েছে।
নিবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিকভাবে অনেক দূর এগোলেও সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের ক্ষেত্রে কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং পরিবর্তনের তীব্র ইচ্ছা শেষ পর্যন্ত একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করেছে। এই পরিবর্তনকে লেখক ‘অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
নিবন্ধে বিশেষভাবে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সাহসিকতার প্রশংসা করা হয়েছে। ডিজিটাল যুগে বাস করা এই প্রজন্ম বৈষম্যের বিরুদ্ধে যেভাবে সোচ্চার হয়েছে, তা দেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তাদের এই আন্দোলন কেবল সরকার পরিবর্তনের জন্য ছিল না, বরং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যেই ছিল।
আলোর রেখা দেখা দিলেও সামনের পথ যে মসৃণ নয়, সে বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ঐক্য দেখা যাচ্ছে, তা সঠিক নেতৃত্ব পেলে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী মডেলে পরিণত করতে পারে।
থারুর স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, নয়াদিল্লি দীর্ঘকাল ধরে ঢাকায় কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির (আওয়ামী লীগ) ওপর বাজি ধরেছিল। কিন্তু এখন সময় এসেছে সেই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার। তিনি বলেন: “ভারতকে এখন হাসিনার প্রতি অতি-নির্ভরশীলতা বা ‘হাসিনা-কেন্দ্রিকতা’ কাটিয়ে উঠতে হবে। তিনি ভারতের একজন অনুগত বন্ধু ছিলেন এবং অবশ্যই তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত হবে না। কিন্তু আমাদের মানতে হবে যে, ২০২৬-এর বিএনপি অনেক বেশি পরিণত এবং তারা ভারতের সাথে সুদৃঢ় কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝে।”
নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর আসন বাড়লেও ভোটাররা তাদের সরকারে না পাঠিয়ে বিরোধী দলে বসিয়েছে। থারুর একে ‘জামায়াত স্নাব’ বা জামায়াতকে উপেক্ষা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের তরুণ ও নারী ভোটাররা কট্টরপন্থার বদলে একটি উদার ও জাতীয়তাবাদী ধারাকে বেছে নিয়েছেন, যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য একটি স্বস্তির খবর।
তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি ও ভারতের করণীয়
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণে সকল ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিকে থারুর ‘একটি সময়োপযোগী আশ্বাস’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ভারতের উচিত হবে, নতুন হাইকমিশনার নিয়োগের মাধ্যমে অতীত তিক্ততা ভুলে সম্পর্কের নতুন সূচনা করা। ভিসা সহজীকরণ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে কানেক্টিভিটি বাড়াতে বাংলাদেশের পাশে থাকা।
বাংলাদেশের ক্রিকেট উন্নয়নে ভারতের সহযোগিতা বাড়ানো, এমনকি বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের আবারও আইপিএলে নিয়মিত করার প্রস্তাব দেন তিনি।বাংলাদেশ সংবাদ
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
নিবন্ধে শশী থারুর গত এক বছরে বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর হওয়া কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা। ভারত যদি এই রূপান্তরকালকে সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারে, তবে বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী বন্ধু হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায়, বৈরী প্রতিবেশী ভারতের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হবে।
শশী থারুরের মতে, “বৃষ্টি শেষ হয়েছে, মেঘ কেটে গেছে।” এখন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পালা। এই নতুন যাত্রায় ভারতকে একজন বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।