মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের প্রভাব: উত্তর থাইল্যান্ডে মাদক স্রোত, ঝুঁকিতে সীমান্তের হাজারো মানুষ

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের প্রভাব: উত্তর থাইল্যান্ডে মাদক স্রোত, ঝুঁকিতে সীমান্তের হাজারো মানুষ

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের প্রভাব: উত্তর থাইল্যান্ডে মাদক স্রোত, ঝুঁকিতে সীমান্তের হাজারো মানুষ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় উত্তর থাইল্যান্ডের কয়েক লাখ মানুষ মাদকের কবলে পড়ছে। সংঘাতের সুযোগে সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদকের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন।

এলাকাটি ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ নামে পরিচিত—যেখানে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের সীমান্ত মিলিত হয়েছে। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ইন্দোচীনে যুদ্ধ চলাকালে এই অঞ্চল ছিল বিশ্বের বৃহত্তম আফিম উৎপাদন কেন্দ্র।

পরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তুলনামূলক শান্তি ফিরে এলে আফগানিস্তান সেই স্থান দখল করে। তবে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ও পরবর্তী গৃহযুদ্ধের পর আবারও মিয়ানমার সেই অবস্থানে ফিরে আসে। একই সঙ্গে সেখানে মেথামফেটামিন শিল্পও দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।

মাদকদ্রব্য থাইল্যান্ডে পাচার হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে মাদক ব্যবহারের হার তিনগুণ বেড়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। এর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীগুলো, যেমন লাহু সম্প্রদায়। প্রায় তিন লাখ লাহু জনগোষ্ঠী সীমান্ত অঞ্চলে বাস করে—যাদের অধিকাংশ মিয়ানমারের শান রাজ্যে, আর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থাইল্যান্ডে।

গবেষকদের মতে, সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে অনেক লাহু মানুষ আফিম ক্ষেতের শ্রমিক বা ছোটখাটো মাদক পাচারকারীর কাজে জড়িয়ে পড়ে।

৭০ বছর বয়সী জাওয়া জাবো আবারও আফিমে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। কফি বাগানে কঠোর পরিশ্রম এবং দাম্পত্য কলহ তাকে আবার মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। পরে তিনি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আসক্তি কাটানোর চেষ্টা করেন।

সীমান্ত থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরের মে আই এলাকায় এক শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠানে এক আধ্যাত্মিক নেতা মোমবাতির ওপর হাত রেখে জাওয়ার শরীর ধরে ‘বিষ’ বের করে দেওয়ার আচার সম্পন্ন করেন।

অনুষ্ঠানে শামান উচ্চারণ করেন,
“সব অশুভ নদীতে বিলীন হয়ে যাক, আর কখনো ফিরে না আসুক।”

অনুষ্ঠানের শেষে জাওয়া একটি পবিত্র সাদা সুতা পুড়িয়ে নিজের কবজিতে বেঁধে নেন—যা তাকে সুরক্ষা দেবে এবং তার প্রতিজ্ঞার স্মারক হিসেবে থাকবে।

জাওয়া বলেন, “এই আচার শেষ হওয়ার পর আমার যন্ত্রণা কমে গেছে। আজ থেকে আমাকে আফিম ছাড়তেই হবে।”

সীমান্তে মাদকের জোগান বাড়ছে

এক কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে ক্যাপ্টেন খেতসোপন নপসিরি ছয় সদস্যের একটি থাই সেনা টহলদল নিয়ে জঙ্গলের কাঁচা পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তাদের হাতে প্রস্তুত অবস্থায় ছিল স্বয়ংক্রিয় রাইফেল।

এই ইউনিটটি মিয়ানমার থেকে আসা মাদক পাচারের রুট পর্যবেক্ষণ করে। সন্দেহভাজন পাচারকারীদের সঙ্গে তাদের নিয়মিত সংঘর্ষ হয়। শুধু নভেম্বর মাসেই চারবার গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

একবার ১০ থেকে ১২ জন সন্দেহভাজন পাচারকারী গোলাগুলির পর পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে তারা রেখে যায় ২২ লাখ মেথামফেটামিন ট্যাবলেট।

ক্যাপ্টেন নপসিরি বলেন, “মাদক উৎপাদন আরও দক্ষ হওয়ায় থাইল্যান্ডে মাদক পাচার বাড়ছে।”

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য আফিম ছিল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ এ অঞ্চলের মাটি অধিকাংশ ফসলের জন্য অনুপযোগী এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণও ছিল দুর্বল।

একই সঙ্গে সংগঠিত অপরাধ চক্রগুলো জঙ্গলের ভেতরে সহজে লুকিয়ে রাখা যায় এমন মেথামফেটামিন ল্যাব পরিচালনা করে। এগুলো থেকে ট্যাবলেট বা ক্রিস্টাল আকারে নিয়মিত উৎপাদন সম্ভব।

মিয়ানমারের অসংখ্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে কিছু—এমনকি সামরিক বাহিনীও—দীর্ঘদিন ধরে মাদক বাণিজ্য থেকে লাভবান হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্য কিছু গোষ্ঠী সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধের অর্থ জোগাতে এ ব্যবসায় জড়িয়েছে।

চলমান সংঘাতের কারণে মাদক দমনের প্রচেষ্টাও ব্যাহত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং তাদের মনোযোগ অন্যত্র।

একই সময়ে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তর (UNODC) জানিয়েছে, কিছু মাদক উৎপাদন এলাকায় তুলনামূলক স্থিতিশীলতা রয়েছে, যা বড় মাদক উৎপাদনকারী গোষ্ঠীগুলোকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অভ্যুত্থানের আগে তিন বছর এবং পরে একই সময়ের তুলনায় দক্ষিণ শান রাজ্যে সংঘাতজনিত ঘটনা ১৭ গুণের বেশি বেড়েছে।

একই সময়ে মিয়ানমারে ক্রিস্টাল মেথামফেটামিন জব্দের পরিমাণ ১৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যদিও অভিযানের সংখ্যা কমেছে।

UNODC জানায়, অভ্যুত্থানের পর আফিম উৎপাদন দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। গত বছর ৫৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে পপি চাষ হয়েছে—যা ২০১৫ সালের পর সর্বোচ্চ।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে UNODC-এর আঞ্চলিক প্রতিনিধি ডেলফিন শান্টজ বলেন,
“প্রথম ভুক্তভোগী হচ্ছে সীমান্তে বসবাসকারী সম্প্রদায়গুলো।”

তিনি বলেন, “যতই তারা উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি থাকে, ততই মাদক সস্তা হয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে মাদক ব্যবহারের হার বাড়ছে।”

পাঁচ বছরে তিনগুণ মাদক ব্যবহার

চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের আটটি প্রদেশে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ অন্তত একবার কঠিন মাদক ব্যবহার করেছে।

২০১৯ সালের জরিপের তুলনায় এটি তিনগুণের বেশি এবং মোট জনসংখ্যার সাত শতাংশেরও বেশি। গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় এই হার আরও বেশি।

মে আই জেলায় প্রায় ১৬ হাজার লাহু জনগোষ্ঠীর বাস—যা থাইল্যান্ডে তাদের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র।

কৃষিকাজ বা দৈনিক মজুরি ছাড়া সেখানে উপার্জনের তেমন সুযোগ নেই। অনেকেই থাই ভাষাও বলতে পারেন না।

সীমান্তে মাদকবিরোধী একটি টাস্কফোর্সের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওরাথেপ বুন্যা বলেন,
“দ্রুত অর্থ উপার্জনের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো মাদক উৎপাদন ও পরিবহন।”

১৯ বছর বয়সী সিত্থিকর্ন পালর প্রাথমিক বিদ্যালয় ছেড়ে দেন এবং তার সৎ বাবার কাছে বড় হন, যিনি ছিলেন নিম্নস্তরের মাদক পাচারকারী।

কিছুদিন কৃষিকাজ করার পর তিনিও মেথামফেটামিন পরিবহনের কাজে জড়িয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, “আমি মাদক সংগ্রহ করে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিতাম।”

তবে পরে তিনি একটি স্থানীয় সহায়তা গোষ্ঠীতে যোগ দেন, যেখানে মানসিক সহায়তা ও থাই ভাষা শেখানো হয়। এরপর তিনি আবার কৃষিকাজে ফিরে আসেন এবং এখন একটি গাড়ি মেরামতের দোকান খোলার স্বপ্ন দেখেন।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

সিত্থিকর্ন বলেন, “তারা আমাকে আমার জীবন বদলাতে উৎসাহ দিয়েছে। সাধারণত আমি কারও কথা শুনি না। কিন্তু তারা বড় ভাইবোনের মতো আচরণ করেছিল, তাই তাদের কথা শুনে আমি সেই কাজ ছেড়ে দিয়েছি।”

বহু বছর ধরে ‘উইথ লাভিং হার্টস’ নামে একটি সংগঠন অসংখ্য লাহু যুবককে সহায়তা করে আসছে।

তবে সংগঠনের এক তরুণ কর্মী চাইয়াফুম পাসায়ে মাত্র ১৭ বছর বয়সে সেনা চেকপোস্টে গুলিতে নিহত হন। সৈন্যরা অভিযোগ করেছিল তিনি মাদক পাচার করছিলেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইউফিন সাজাকে সাত বছর আইনি লড়াই করতে হয়।

তিনি বলেন, “লাহু শিশুদের অলস, অশিক্ষিত বা মাদকাসক্ত বলে যে কলঙ্ক দেওয়া হয়, তার পেছনে বাস্তবতা হলো—তারা শুধু নিজেরাই বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে।”


এই প্রতিবেদনটি AFP ও HaRDstories-এর যৌথ উদ্যোগে প্রস্তুত করা হয়েছে, যার সহায়তা দিয়েছে Pulitzer Center।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed