সাইবার প্রতারণা দমনে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ: মিয়ানমারসহ আশ্রয়দাতা দেশগুলোর জন্য সতর্কবার্তা

সাইবার প্রতারণা দমনে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ: মিয়ানমারসহ আশ্রয়দাতা দেশগুলোর জন্য সতর্কবার্তা

সাইবার প্রতারণা দমনে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ: মিয়ানমারসহ আশ্রয়দাতা দেশগুলোর জন্য সতর্কবার্তা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তঃদেশীয় সাইবার অপরাধী চক্র মোকাবিলায় একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ মিয়ানমারের সামরিক জান্তাসহ সেই সব দেশ ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা, যারা প্রতারণা কেন্দ্রগুলোকে আশ্রয় দিয়ে আসছে।

গত শুক্রবার ট্রাম্প এই নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। হোয়াইট হাউজ-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পরিবার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত “সাইবার অপরাধ, প্রতারণা ও শোষণমূলক স্কিম” দমনের উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শুধু ২০২৪ সালেই অনলাইন প্রতারণার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা ১২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ হারিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধবিরোধী গবেষণা সংস্থা Global Initiative Against Transnational Organized Crime (জিআই-টিওসি)-এর জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ Jason Tower বলেন, “এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র এখনও আমেরিকানদের কাছ থেকে বিলিয়ন ডলার লুটে নেওয়া প্রতারণা চক্রগুলো ভেঙে দেওয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে।”

সাইবার প্রতারণা ইস্যু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা টাওয়ার আরও বলেন, এই প্রেসিডেন্টের পদক্ষেপ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা, যারা অনলাইন অপরাধীদের আশ্রয় দিচ্ছে।

তার ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্র কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ বাড়াবে। পাশাপাশি এসব অপরাধের পেছনে থাকা চীন-সম্পর্কিত অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো নিয়ন্ত্রণে আরও পদক্ষেপ নিতে চীনের ওপরও চাপ সৃষ্টি করবে।”

সীমান্তের থাই দিক থেকে মায়ানমারের জালিয়াতি কেন্দ্রগুলিতে এফবিআই এজেন্টরা দূরবীন দিয়ে দেখছে। / এফবিআই

প্রতারণা চক্র মোকাবিলায় কর্মপরিকল্পনা

নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, প্রতারণা চক্র মোকাবিলায় কী ধরনের কার্যকরী, প্রযুক্তিগত, কূটনৈতিক এবং নিয়ন্ত্রক উপায় উন্নত করা যায় তা নির্ধারণ করতে।

একই সঙ্গে এসব চক্রের কার্যক্রম “প্রতিরোধ, ব্যাহত, তদন্ত এবং ভেঙে ফেলার” জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরির কথাও বলা হয়েছে।

বিশেষ করে মিয়ানমারের মতো শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই আদেশে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিদেশি সরকারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের দেশে সক্রিয় প্রতারকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে উৎসাহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, ভিসা সীমাবদ্ধতা, বৈদেশিক সহায়তা কমানো বা বন্ধ করা এবং সহযোগী কর্মকর্তাদের বহিষ্কার করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান R Street Institute এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এই নির্বাহী আদেশ “অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত একটি পদক্ষেপ” এবং এর মাধ্যমে প্রশাসনের জন্য বাস্তব অগ্রগতি অর্জনের “গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ” তৈরি হয়েছে।

তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেন, “এই উদ্যোগ সফল করতে হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রযুক্তি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয় ও সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।”

এফবিআই-থাই পুলিশের যৌথ উদ্যোগ

এ ধরনের সহযোগিতা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

মার্কিন তদন্ত সংস্থা Federal Bureau of Investigation (ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—এফবিআই) গত ৩ মার্চ জানায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতারণা কেন্দ্রগুলো মোকাবিলায় তারা Royal Thai Police (রয়্যাল থাই পুলিশ) এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে।

ঘোষণার সঙ্গে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, থাইল্যান্ড সীমান্তের দিক থেকে মিয়ানমারের ভেতরে অবস্থিত প্রতারণা কেন্দ্রগুলোর দিকে দূরবীন দিয়ে নজর রাখছেন এফবিআই এজেন্টরা।

তারা “স্ক্যাম সেন্টার স্ট্রাইক ফোর্স (এসসিএসএফ)” নামে একটি বিশেষ টাস্কফোর্সের অধীনে দায়িত্ব পালন করছেন। গত নভেম্বর মাসে U.S. Attorney’s Office for the District of Columbia, U.S. Department of Justice Criminal Division, এফবিআই এবং U.S. Secret Service যৌথভাবে এই টাস্কফোর্স গঠন করে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে কারেন রাজ্যের মায়াওয়াডি টাউনশিপের ফালু এলাকায় প্রতিরোধ কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন কর্তৃক দখলের পর সরকারপন্থী ডেমোক্র্যাটিক কারেন বেনেভোলেন্ট আর্মির সুরক্ষায় চীনা-পরিচালিত একটি জালিয়াতি কেন্দ্র / KNU

মিয়ানমার সীমান্তে প্রতারণা কেন্দ্রের কার্যক্রম অব্যাহত

এদিকে সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমার-থাইল্যান্ড সীমান্তে চীনা পরিচালিত প্রতারণা কেন্দ্রগুলো এখনও স্বাভাবিকভাবেই চলছে। এসব কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে জান্তাসমর্থিত Karen State Border Guard Force (কারেন স্টেট বর্ডার গার্ড ফোর্স—বিজিএফ) এবং Democratic Karen Benevolent Army (ডেমোক্রেটিক কারেন বেনেভোলেন্ট আর্মি—ডিকেবিএ) নিয়ন্ত্রিত এলাকায়।

এই দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতাদের ওপর ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

কারেন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, এফবিআই এজেন্টরা মিয়াওয়াদি টাউনশিপের কুখ্যাত প্রতারণা কেন্দ্র Shwe Kokko এলাকা পরিদর্শন করেন। এটি একসময় সবচেয়ে আলোচিত প্রতারণা কেন্দ্র ছিল, যা পরে জান্তা বন্ধ করে দেয়।

তবে সূত্রটি জানায়, চোখের আড়ালেই মিয়াওয়াদি শহর, থিট কাদে, ফালু, মে হ্তও থালায়, কিয়াউক খেত এবং ফায়াথোনজু এলাকায় অনলাইন প্রতারণা কার্যক্রম এখনও চলমান।

সূত্রটি বলেন, “এফবিআই ও থাই পুলিশ এসব সক্রিয় প্রতারণা কেন্দ্রগুলোও যাচাই করেছে কি না, তা আমরা নিশ্চিত নই। জ্বালানি সংকট এবং এফবিআইয়ের পদক্ষেপের পরও এসব প্রতারণা কেন্দ্র তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।”

মিয়াওয়াদির আরেক বাসিন্দাও একই দাবি করেন। তার মতে, প্রতারণা কেন্দ্রগুলো এমনকি তখনও নির্বিঘ্নে চলছিল, যখন তাদের কম্পাউন্ডের দুই পাশেই প্রতিরোধ বাহিনী এবং জান্তা-সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছিল।

জান্তার অভিযান নিয়ে প্রশ্ন

বর্ধিত আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরে জান্তা Shwe Kokko এবং KK Park এলাকায় প্রকাশ্য অভিযান চালায়।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা ওই অভিযানকে কেবল প্রচারণামূলক কৌশল বা “পিআর স্টান্ট” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার জন্যই এমন অভিযান পরিচালনা করা হয়।

পরবর্তীতে জান্তা ডিসেম্বর মাসে টেলিকম প্রতারণা ও অনলাইন জুয়া দমনে ১৬ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় তদারকি কমিটি গঠন করে।

কিন্তু সম্প্রতি ওই কমিটির চেয়ারম্যানকে পদচ্যুত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, উত্তর শান রাজ্যে প্রতারণা চক্রগুলোর কাছ থেকে নিরাপত্তা বাবদ অর্থ নেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছিল।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *