মিয়ানমারের কাচিন বিদ্রোহীদের সঙ্গে জান্তার সংলাপ চায় চীন
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের কাচিন স্বাধীনতা সংস্থা/সেনা (কেআইও/কেআইএ)-কে সামরিক জান্তার সঙ্গে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছে চীন। কেআইওর মুখপাত্র কর্নেল নাও বু এ তথ্য জানিয়েছেন।
তার মতে, গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে চীনের ইউনান প্রদেশে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে চীনের সীমান্তবিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কেআইওর শীর্ষ নেতাদের কাছে এই প্রস্তাব তুলে ধরেন। বৈঠকে কেআইও চেয়ারম্যান জেনারেল এন’বান লা এবং উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুন মাও উপস্থিত ছিলেন।
কর্নেল নাও বু জানান, বৈঠকটি আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা ছিল না; বরং নিয়মিত আলোচনার অংশ হিসেবেই বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। তবে এটি কেআইএ এবং জান্তার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার জন্য বেইজিংয়ের সর্বশেষ উদ্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “তারা বলেছে, সামরিক কাউন্সিলের (জান্তা) সঙ্গে দেখা করে কথা বলা ভালো হতে পারে। এটি কোনো নির্দেশ বা চাপ ছিল না—চন্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে হওয়া একটি স্বাভাবিক বৈঠকের সময় তারা শুধু এ কথা উল্লেখ করেছে।”
একক আলোচনায় অনড় আপত্তি
তবে কেআইও বরাবরই জান্তার সঙ্গে একান্ত দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
৮ ফেব্রুয়ারি ৬৫তম কাচিন বিপ্লব দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বক্তব্যে লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুন মাও বলেন, কেআইও ইতোমধ্যে নেপিদোকে জানিয়ে দিয়েছে—যে কোনো রাজনৈতিক সংলাপে বেসামরিক ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) এবং অন্যান্য বিপ্লবী গোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তবে সামরিক জান্তা এনইউজির সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। জান্তা এনইউজিকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে।
সীমান্তে উত্তেজনা না বাড়ানোর অনুরোধ
ইউনানের ওই বৈঠকে চীনা কর্মকর্তারা কেআইও নেতাদের মার্চ মাসে সংঘর্ষের মাত্রা না বাড়ানোরও আহ্বান জানান। কারণ হিসেবে তারা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিতব্য চীনের বার্ষিক “টু সেশনস” সভা এবং সীমান্ত অঞ্চলে স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
একই বৈঠকে চীনা কর্মকর্তারা জানতে চান, ২০ ফেব্রুয়ারি মিতচিনা বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার সঙ্গে কেআইও জড়িত কি না।
ওই হামলায় একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামরিক জান্তা এ হামলার জন্য কেআইএ এবং এনইউজির পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস (পিডিএফ)-কে দায়ী করে।
তবে কেআইও এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করার কোনো নীতি তাদের নেই। কর্নেল নাও বু বলেন, সংগঠনটি হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ পুনরায় প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিমান হামলা ও সংঘর্ষ বৃদ্ধি
বিমানবন্দর হামলার পর সামরিক জান্তা কেআইএ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় একাধিক বিমান হামলা চালায়। একই সঙ্গে কেআইওর সদর দপ্তরের কাছে লাইজা এলাকায় ড্রোন হামলাও চালানো হয়, যাতে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটে।
কেআইএর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান থেকে বিরত থাকার জন্য গত কয়েক বছর ধরেই চীন নীরবে চাপ দিয়ে আসছে।
গত মাসে লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুন মাও প্রকাশ করেন, চীনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তাকে প্রশ্ন করেছিলেন—জান্তাবিরোধী বাহিনীর কি সত্যিই সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করার মতো শক্তি রয়েছে?
এর উত্তরে গুন মাও চীনের নিজস্ব বিপ্লবী ইতিহাসের উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিদেশি শক্তির সমর্থনপুষ্ট কুওমিনতাং শেষ পর্যন্ত তাইওয়ানে পালিয়ে যায়, আর তুলনামূলকভাবে কম সম্পদসম্পন্ন পক্ষই বিজয়ী হয়।
তার এ উত্তরের পর আলোচনাটি সেখানেই শেষ হয়ে যায় বলে জানা গেছে।
মিতসোনে বাঁধ প্রকল্প নিয়ে উত্তেজনা
কেআইও ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে আরও জটিল হয়ে উঠেছে মিতসোনে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে।
চীন-সমর্থিত এই মেগা বাঁধ প্রকল্পটি ২০১১ সালে দেশজুড়ে বিক্ষোভের পর স্থগিত করা হয়েছিল। সম্প্রতি সামরিক জান্তা আবার প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
কেআইও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কাচিন জনগণের সম্মতি ছাড়া এই প্রকল্প পুনরায় শুরু করা যাবে না। ভূমিকম্পের ঝুঁকি, পরিবেশগত ক্ষতি এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কায় স্থানীয় জনগণের বড় অংশ এ প্রকল্পের বিরোধিতা করছে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এসপিআইসি ইউনান ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার ইনভেস্টমেন্ট সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন পুনরায় শুরু করেছে। একই সঙ্গে চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে সামরিক জান্তার নেতারা প্রকল্পটি পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কাচিনে লড়াই অব্যাহত
বেইজিংয়ের সংযমের আহ্বান সত্ত্বেও কাচিন রাজ্যজুড়ে সংঘর্ষ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
বর্তমানে কেআইএ রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে জান্তার কাছ থেকে দখল করা এলাকাগুলো পুনর্দখলের চেষ্টা চালাতে গিয়ে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ভামো, হপাকান্ত এবং ওয়াইংমাও এলাকায় নিয়মিত সংঘর্ষ চলছে।
বিরল মাটির খনি নিয়ে নতুন সমীকরণ
কেআইএ এবং চীনের সম্পর্ক আরও জটিল করে তুলেছে কাচিন-চীন সীমান্তে বিরল মাটির (রেয়ার আর্থ) খনিগুলোর ওপর কেআইএর ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ।
এই শিল্পে প্রধান ক্রেতা চীনা কোম্পানিগুলো। গত দুই বছরে কেআইএ-সমর্থিত বাহিনী পাংওয়া ও চিপউই এলাকার গুরুত্বপূর্ণ খনিগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
এর ফলে প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের এই বাণিজ্যের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা অর্জন করেছে কেআইও।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।