পশ্চিমা শক্তি, রাষ্ট্রগঠন ও ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ প্রশ্ন: ইতিহাস কী বলে?

পশ্চিমা শক্তি, রাষ্ট্রগঠন ও ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ প্রশ্ন: ইতিহাস কী বলে?

পশ্চিমা শক্তি, রাষ্ট্রগঠন ও ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ প্রশ্ন: ইতিহাস কী বলে?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

ড. সরদার এ. হায়দার

সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত-রাজনীতি এবং জাতিগত পরিচয় নিয়ে নানা আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত, মায়ানমার এবং বাংলাদেশের পার্বত্য সীমান্তঘেঁষা অঞ্চল নিয়ে নানা ধরনের আশঙ্কা, ব্যাখ্যা এবং অভিযোগ জনপরিসরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব আলোচনার মধ্যে একটি প্রশ্ন বারবার উঠছে, পশ্চিমা শক্তিগুলো কি কখনও কোনো অঞ্চলে খ্রিস্টান পরিচয়কে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র গঠনে উদ্যোগী হয়েছে? প্রশ্নটি সংবেদনশীল, কিন্তু একে এড়িয়ে গেলে চলবে না। আবার আবেগ দিয়ে উত্তর দিলেও ভুল হবে। ইতিহাস, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং রাষ্ট্রগঠন-তত্ত্বের আলোকে এ প্রশ্নকে ঠান্ডা মাথায় দেখা দরকার।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। পশ্চিমা দেশগুলো সাধারণত প্রকাশ্যে “খ্রিস্টান রাষ্ট্র” গঠনের ভাষা ব্যবহার করে না। তাদের কূটনৈতিক ও নীতিগত ভাষা ভিন্ন। তারা কথা বলে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, সংখ্যালঘু সুরক্ষা, মানবিক হস্তক্ষেপ, ঔপনিবেশিক পুনর্বিন্যাস, স্থিতিশীলতা, অথবা নিরাপত্তা বলয়ের প্রশ্নে। কিন্তু বাস্তবতার জটিলতায় কখনও কখনও এমন রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক সত্তার উদ্ভব ঘটেছে, যেখানে খ্রিস্টান পরিচয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক উপাদান হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ ধর্ম সব সময় ঘোষিত লক্ষ্য নয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা রাজনৈতিক প্রকল্পের কার্যকর ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

এ প্রসঙ্গে লেবাননের উদাহরণটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স “Greater Lebanon” গঠন করে এবং মারোনাইট খ্রিস্টানদের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা নতুন রাষ্ট্রিক কাঠামোকে বিশেষ রূপ দেয়। ফ্রান্সের উদ্দেশ্য কেবল ধর্মীয় ছিল না; সেখানে ঔপনিবেশিক প্রভাব ধরে রাখা, একটি বন্ধুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সত্তা তৈরি করা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যে নিজেদের অবস্থান শক্ত করা ছিল বড় বিষয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রটির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় খ্রিস্টান রাজনৈতিক প্রভাব বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখান থেকে বোঝা যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পশ্চিমা শক্তি এমন একটি রাষ্ট্রীয় বিন্যাসকে সমর্থন করে, যেখানে তাদের আস্থাভাজন ধর্মীয়-সামাজিক গোষ্ঠী অগ্রাধিকার পায়।

টিমর-লেস্তের অভিজ্ঞতাও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। এই রাষ্ট্রের উদ্ভবকে সরাসরি “পশ্চিমারা একটি খ্রিস্টান দেশ বানিয়েছে” বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং এখানে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, ইন্দোনেশীয় দখলবিরোধী সংগ্রাম এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রশ্ন একত্রে কাজ করেছে। তবে এটিও সত্য যে টিমর-লেস্তের জাতীয় পরিচয় ও প্রতিরোধে ক্যাথলিক চার্চ একটি শক্তিশালী প্রতীকী ও সামাজিক শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্রগঠনের আনুষ্ঠানিক ভাষা ছিল রাজনৈতিক ও আইনি, কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় সেই রাষ্ট্রীয় সত্তার ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দক্ষিণ সুদানের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও জটিল। সেখানে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল উত্তর সুদানের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বঞ্চনা, গৃহযুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয় এবং ইসলামপন্থী রাষ্ট্রচর্চার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে। পশ্চিমা সমর্থন ছিল, আন্তর্জাতিক সহানুভূতিও ছিল; কিন্তু একে কেবল “খ্রিস্টান রাষ্ট্র” বানানোর প্রকল্প হিসেবে দেখলে বাস্তবতা ছোট হয়ে যায়। দক্ষিণ সুদান বরং দেখায়, যখন ধর্মীয় বিভাজন রাজনৈতিক বঞ্চনার সঙ্গে মিশে যায়, তখন নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হতে পারে; যদিও তার ভাষা থাকে আত্মনিয়ন্ত্রণ, শান্তিচুক্তি এবং মানবিক ন্যায়ের প্রশ্নে।

এখানে মূল প্রশ্ন হলো, কোন পরিস্থিতিতে পশ্চিমা শক্তি এমন একটি রাজনৈতিক সত্তাকে সমর্থন করতে পারে, যার ভেতরে খ্রিস্টান পরিচয় জোরালো? ইতিহাস বলছে, কয়েকটি শর্ত প্রায়ই একসঙ্গে কাজ করে। প্রথমত, যখন কোনো খ্রিস্টান বা অমুসলিম জনগোষ্ঠীকে তারা নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখে। দ্বিতীয়ত, যখন বিদ্যমান রাষ্ট্রকে তারা বৈরী, দমনমূলক, বা অস্থিতিশীল মনে করে। তৃতীয়ত, যখন আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সংখ্যালঘু সুরক্ষার আইনি-নৈতিক ভাষা আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য হয়। চতুর্থত, যখন নতুন সত্তাটি কৌশলগতভাবে বাফার, প্রভাববলয়, বা বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করতে পারে। পঞ্চমত, যখন মানবিক সংকট আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগঠনে সহায়ক হয়। এসব ক্ষেত্রেই ধর্ম একক কারণ নয়; বরং কৌশলগত স্বার্থ, নৈতিক ভাষ্য ও পরিচয়-রাজনীতির সমন্বয়ে ফলাফল তৈরি হয়।

এই আলোচনায় আরেকটি সতর্কতা জরুরি। সব খ্রিস্টান-প্রধান রাষ্ট্র পশ্চিমা পরিকল্পনার ফল নয়, আবার সব পশ্চিমা হস্তক্ষেপও খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের জন্য হয় না। রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস কখনও এত সরল নয়। এতে থাকে দীর্ঘমেয়াদি মিশনারি প্রভাব, শিক্ষাব্যবস্থা, স্থানীয় এলিট গঠন, ভাষা-পরিচয়ের রূপান্তর, সশস্ত্র সংঘাত, আন্তর্জাতিক আইন, এবং বড় শক্তির কৌশলগত হিসাব। তাই কোনো অঞ্চলে খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী আছে বলেই সেখানে একটি “পশ্চিমা রাষ্ট্র-প্রকল্প” সক্রিয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো একাডেমিকভাবে দুর্বল।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

বাংলাদেশের জন্য এই আলোচনার তাৎপর্য আছে। কারণ আমাদের পার্বত্য অঞ্চল, মায়ানমারের চিন ও রাখাইন এলাকা, এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু অংশে জাতিগত আত্মপরিচয়, সীমান্ত-অতিক্রমী সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় বৈচিত্র্য এবং নিরাপত্তা-সংকট একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই বাস্তবতায় কোনো বিদেশি নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষক, অস্ত্রপ্রবাহ বা রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা দরকার যে, নিরাপত্তা-ঝুঁকি ও রাষ্ট্রভাঙার সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক নীলনকশা এক জিনিস নয়। এ দুটির মধ্যে পার্থক্য না করলে আমরা বিশ্লেষণের বদলে আতঙ্ক ছড়াব।

আমার মতে, সবচেয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান হবে এই যে, ইতিহাস আমাদের শেখায়, পশ্চিমা শক্তি কখনও কখনও এমন রাষ্ট্রীয় পুনর্বিন্যাসকে সমর্থন করেছে, যেখানে খ্রিস্টান পরিচয় কার্যকর রাজনৈতিক উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সেটিকে সব সময় “খ্রিস্টান রাষ্ট্র তৈরির সরাসরি ষড়যন্ত্র” বলা সঠিক নয়, বরং দেখতে হবে ক্ষমতার সম্পর্ক, কৌশলগত স্বার্থ, স্থানীয় বঞ্চনা, আন্তর্জাতিক আইন, এবং মানবিক ভাষ্যের ব্যবহার সবকিছু একসঙ্গে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদেরও তাই আবেগ নয়, প্রমাণনির্ভর বিশ্লেষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

রাষ্ট্রগঠন কখনও শুধু মানচিত্রের প্রশ্ন নয়; এটি পরিচয়, ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং বৈধতার প্রশ্নও। ইতিহাসের পাঠ হলো, যেখানে ধর্ম, কৌশল ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ এক বিন্দুতে এসে মেলে, সেখানেই নতুন রাজনৈতিক সত্তার বীজ রোপিত হতে পারে। কিন্তু সেই বীজ থেকে রাষ্ট্র গজাবে কি না, তা নির্ভর করে কেবল বাইরের শক্তির ওপর নয়; অনেক বেশি নির্ভর করে ভেতরের বাস্তবতার ওপর।

তথ্যসূত্র: Encyclopaedia Britannica; Oxford Public International Law; Journal of Law and Religion (Cambridge University Press); Cambridge University Press chapter on Timor-Leste and self-determination.