জ্বালানির খোঁজে আবার বনে যাচ্ছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গারা

জ্বালানির খোঁজে আবার বনে যাচ্ছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গারা

জ্বালানির খোঁজে আবার বনে যাচ্ছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গারা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

ত্রিপলের ছাউনির ছোট্ট ঘরে স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে থাকেন কাদির হোসেন। গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ঘরে ব্যবহারের জন্য তিনি বিনা মূল্যে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার পেতেন। এটি দিয়েই কোনো রকমে এক মাস চলতেন তিনি। তবে এখন গ্যাসের সিলিন্ডার পাচ্ছেন প্রতি ৪৫ দিনে একবার। তাই বাধ্য হয়ে কাঠ সংগ্রহ করতে বনে যেতে হচ্ছে তাঁকে।

কাদির হোসেন কক্সবাজারের উখিয়ার মধুরছড়া আশ্রয়শিবিরে বাসিন্দা। তাঁর অভিযোগ, জাতিসংঘের সহায়তা হিসেবে তিনি যে গ্যাস পান, সেটি দিয়ে কোনো রকমে ২০ থেকে ২৫ দিন চলতে পারেন। আশ্রয়শিবিরে আর কোনো জ্বালানির ব্যবস্থা নেই। তাই কাঠ জোগাড় করতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে যাচ্ছেন তাঁরা।

অবশ্য শুধু কাদির হোসেন নন। একই অবস্থা কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরের অন্য বাসিন্দাদেরও। সম্প্রতি আশ্রয়শিবিরে গিয়ে অন্তত ২৫ জন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া যায়। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এভাবে চলতে হচ্ছে তাঁদের।

উপজেলার লম্বাশিয়া ও বালুখালী আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নুরুল আলম, রহিম উল্লাহ ও সুলতান আহমদ জানান, বর্তমানে ৪৫ দিনের জন্য যে ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার দেওয়া হচ্ছে, তা ১৫ থেকে ২০ দিনের বেশি চলে না। উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাজারে একটি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার টাকার বেশি, যা তাঁদের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। এ ছাড়া খাদ্যসহায়তাও কমে গেছে। আগে মাসে ১২ ডলার করে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হতো। এখন ৭ থেকে ১২ ডলার দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বনভূমি ধ্বংস হওয়ায় হাতি চলাচলের করিডর বন্ধ হয়ে গেছে, আবাসস্থল ও জলাশয় নষ্ট হয়েছে। এতে ৬৭টি বন্য হাতি খাদ্য ও পানির সংকটে পড়েছে। গ্যাস–সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে বনাঞ্চল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

—আবদুল্লাহ আল মামুন, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, কক্সবাজার দক্ষিণ

আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গারা জানান, প্রতিটি পরিবারের দৈনিক প্রায় পাঁচ কেজি করে কাঠের প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে ২০ দিনের জন্য প্রয়োজন পড়ে ১০০ কেজি লাকড়ি। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে ২ লাখ ৪৫ হাজার পরিবারে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি। প্রতি মাসে প্রয়োজন হচ্ছে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ কেজি বা ৬ লাখ ১২ হাজার ৫০০ মণ কাঠ। এসব কাঠের পুরোটাই সংগ্রহ করা হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে।

বন বিভাগ, রোহিঙ্গা নেতা ও পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহ কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের অন্তত ২০ দিন জ্বালানি কাঠের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে একদিকে বন উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে এসব রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির গড়ে তোলা হয়েছিল।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, গ্যাস–সংকটের কারণে রোহিঙ্গারা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছপালা কেটে নিচ্ছেন। পাহারা বসিয়েও বন রক্ষা করা যাচ্ছে না। ২০১৭ সালের আগে উখিয়া-টেকনাফে প্রায় ১০ হাজার একর বনায়ন করা হয়েছিল। আশ্রয়শিবির নির্মাণের সময় তা নষ্ট হয়ে যায়। পরে নতুন করে আরও সাত হাজার একরে বনায়ন করা হলেও এখন জ্বালানি কাঠের চাপে সেগুলোও ঝুঁকিতে পড়েছে।

২০১৭ সালের আগে উখিয়া-টেকনাফে প্রায় ১০ হাজার একর বনায়ন করা হয়েছিল। আশ্রয়শিবির নির্মাণের সময় তা নষ্ট হয়ে যায়। পরে নতুন করে আরও সাত হাজার একরে বনায়ন করা হলেও এখন জ্বালানি কাঠের চাপে সেগুলোও ঝুঁকিতে পড়েছে।

আবদুল্লাহ আল মামুন বলে, বনভূমি ধ্বংস হওয়ায় হাতির চলাচলের করিডর বন্ধ হয়ে গেছে, আবাসস্থল ও জলাশয় নষ্ট হয়েছে। এতে ৬৭টি বন্য হাতি খাদ্য ও পানির সংকটে পড়েছে। গ্যাস–সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে বনাঞ্চল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, তহবিলসংকটের কারণে আগে মাসিক যে গ্যাস সিলিন্ডার দেওয়া হতো, এখন সেটি ৪৫ দিনের জন্য ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ দিনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণে রোহিঙ্গারা বন থেকে কাঠ সংগ্রহ করছেন।

বনভূমি উজাড় করে গড়ে তোলা একটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং থেকে তোলা
বনভূমি উজাড় করে গড়ে তোলা একটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং থেকে তোলা

সংকট আরও তীব্র হচ্ছে

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উখিয়া–টেকনাফের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের সুরক্ষা এবং আশ্রয়শিবিরে নিরাপদ জ্বালানি নিশ্চিত করতে সেফ প্লাস কর্মসূচির আওতায় ২০১৮ সালে আশ্রয়শিবিরগুলোর ২ লাখ ৪৫ হাজার পরিবারে এলপিজি বিতরণ কর্মসূচি চালু করা হয়। বর্তমানে এ কর্মসূচি সেফ প্লাস-টু নামে পরিচিত। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) যৌথভাবে এই এলপিজি সরবরাহ কর্মসূচি পরিচালনা করছে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) এক কর্মকর্তা বলেন, এলপিজি ব্যবহারের ফলে গত সাত বছর বন উজাড় ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমেছে। আশ্রয়শিবিরসমূহে অধিকাংশ ঘর বাঁশসহ দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি, আগুন লাগলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে এলপিজি নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারে এলপিজি দেওয়ার আগে তাদের এক ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ ছাড়া মানবিক সংস্থাসমূহের যৌথ উদ্যোগে গত কয়েক বছরে উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরসমূহে তিন হাজার হেক্টর ভূমিতে কয়েক লাখ বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। এই গাছ পাহাড়ি ঢলে মাটি শক্ত রাখতে ভূমিকা রাখছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, রোহিঙ্গারা যেভাবে বনাঞ্চল উজাড় করছেন, গাছপালা কেটে নিচ্ছেন, এমন অবস্থা আগামী জুন পর্যন্ত চলমান থাকলে উখিয়া-টেকনাফের সংরক্ষিত বনে গাছপালা অবশিষ্ট থাকবে না। ২০১৭-২০১৮ সালে ৩৪টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির নির্মাণ করতে ২ হাজার ২৭ একর সৃজিত বনাঞ্চল এবং ৪ হাজার ১৩৬ একর প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করা হয়েছিল। তাতে পাহাড়ধসের ঘটনাও বেড়েছে। হাতির বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়ায় এশিয়ান জাতের ৬৭টি হাতি খাদ্যসংকটে পড়েছিল। হাতির আক্রমণে গত ৮ বছরে ১১ রোহিঙ্গাসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক নারী-পুরুষ।

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস–সংকটের কারণে আশ্রয়শিবিরের আড়াই লাখ রোহিঙ্গা এখন প্রতি মাসে সাত লাখ মণ কাঠ পোড়াচ্ছেন। এর পুরোটাই আশপাশের বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্য, বন্য প্রাণী ও পরিবেশ রক্ষা করতে হলে রোহিঙ্গা পরিবারে দ্রুত এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

-প্রথম আলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *