আব্দুর রশিদ সরকারের ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী: স্মরণে এক রক্তাক্ত ইতিহাস, বিচারহীনতার আক্ষেপ
![]()
নিউজ ডেস্ক
রাঙামাটি পার্বত্য জেলার লংগদু উপজেলার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ সরকারের ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৮৯ সালের ৪ মে সংঘটিত তার হত্যাকাণ্ড এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক আলোচিত ও বেদনাবিধুর অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হয়।
জানা যায়, বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার বাসিন্দা আব্দুর রশিদ সরকার ছিলেন মৃত আব্দুল গনি হাওলাদারের পুত্র। তিনি একজন সৎ ও জন দরদী মানুষ ছিলেন। তিনি নিজ এলাকায় মাদ্রাসা লাইনে ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষা গ্রহন শেষ করে পটুয়াখালীতে একটি দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। ১৯৭৬ সালে প্রথম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন রশিদ। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা হতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালিদের বিভিন্ন সুবিধাদি দেয়ার কথা বা পূর্ণবাসনের ব্যাপারে জানতে পেরে ঢাকার হাজি ক্যাম্পে গমন করেন এবং স্ত্রীসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে আসেন। হাজি ক্যাম্প থেকে আগত লোকদের মাঝে তাকে লংগদু উপজেলার ইয়ারাংছড়ি এলাকায় গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে পাঠানো হয়। স্থানীয় বাঙালিদের পাশে থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ ও নেতৃত্বদানের ফলে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা হতে হাজি ক্যাম্পে আগত লোকদেরকে ৩৫ টি গ্রুপে ভাগ করে পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় প্রেরণ করে তৎকালীন সরকার। তার মধ্যে আঃ রশিদ সরকারকে একটি গ্রুপ কমান্ডার করে লংগদু উপজেলার ইয়ারাংছড়ি এলাকায় পাঠানো হয় এবং তার নেতৃত্বগুন থাকায় বিভিন্ন বিষয়ের উপর তাকে কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। এছাড়াও পাশ্ববর্তী এলাকায় আরো ৪ টি গ্রুপের গ্রুপ কমান্ডার করা হয় তাকে। এর পাশাপাশি তিনি ইয়ারাংছড়িতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। তার মেধা-শক্তি ও নেতৃত্বগুন এবং সাধারন বাঙ্গালীদের উপর মানবিকতার করনে অত্র এলাকার বাঙ্গালী সাধারন জনগন আঃ রশিদ সরকারকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রস্তাব করেন। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে লংগদু সদর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হলে তিনি ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার সততার কারনে ও জনসাধারনের প্রতি ভালো মনোভাব থাকায় দীর্ঘ সাড়ে চার বছর লংগদু সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেন।
পরে ১৯৮৫ সালে প্রথম উপজেলা নির্বাচনে স্থানীয় বাঙ্গালীরা তাকে উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রস্তাব দিলে তিনি রাজি হননি। কিন্তু বাঙ্গালীদের দাবি দাওয়া ও ভালবাসার টানে বিশেষ করে বাঙ্গালীদের পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আদায়ের কথা চিন্তা করে তিনি প্রার্থী হন এবং বিপুল ভোট পেয়ে প্রথম লংগদু উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং স্থানীয় বাঙালিদের প্রতিনিধিত্বে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর সততা, নেতৃত্বগুণ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে এক প্রিয় মুখে পরিণত করে।
তৎকালীন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় ছিল সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসীগোষ্ঠী শান্তিবাহিনী। শান্তিবাহিনীকে চাঁদা দিতে অপারগতা, সন্ত্রাসদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, মিছিল-মিটিং-সভা-সমাবেশে নেতৃত্ব প্রদান, বাঙ্গালী সংগঠন থেকে বেরিয়ে না আসা, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া এবং শান্তিবাহিনীর ডাকে সাড়া না দেওয়া, পরিশেষে শান্তিবাহিনী তাকে লংগদুর বড়াদম নামক এলাকায় দেখা করে উভয়ের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির জন্য কথা বলবেন বলে ডাকলেও তিনি যাননি, ফলে তার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে যায় শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা। তারা তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
পরে মাইনি বাজার থেকে নিজ বাসায় ফেরার পথে লংগদু উপজেলার কাঠালতলা এলাকায় মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার শরীরে ১০টি বুলেট ঢুকে যায়। ১৯৮৯ সালের ৪ মে, পবিত্র রমজানের ২৭তম দিবস। গোধূলির শান্ত আকাশে সূর্য তখনও অস্ত যায়নি। ইফতারের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে, নিঃশব্দে নিভে যায় এক অক্লান্ত কর্মীর প্রাণ—যিনি পাহাড়ি জনপদে বাঙালির মুখপাত্র ছিলেন। হামলাকারীরা তার মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে একাধিক গুলি চালায়, এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। যা কেবল একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতার জীবন শেষ করেনি, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি নেতৃত্ব ও অস্তিত্বের উপর চালিয়ে দেয় ভয়াবহ আঘাত।
এই ঘটনাটি শুধু আব্দুর রশিদ সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের উপর দীর্ঘদিনের সহিংস রাজনীতিরই ধারাবাহিকতা। রশিদ সরকার হত্যা পরবর্তী সময়ে শান্তিবাহিনী পুনরায় গুলি চালিয়ে বহু নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে। ইতিহাসে এই ঘটনা ‘লংগদু গণহত্যা’ নামে পরিচিত।
গবেষণায় দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ছোট-বড় প্রায় ৪৬টি গণহত্যার তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষ্য একটাই—পার্বত্য অঞ্চল থেকে বাঙালিদের চিরতরে উচ্ছেদ করা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, দীর্ঘ তিন যুগ পার হলেও আজ পর্যন্ত আব্দুর রশিদ সরকারসহ এইসব হত্যাকাণ্ডের কোনও বিচার হয়নি।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর শান্তিবাহিনী নাম পাল্টে নতুন পরিচয়ে (জেএসএস) আত্মপ্রকাশ করলেও, সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও ইতিহাস বিকৃতির ধারা অব্যাহত রেখেছে। মানবাধিকার ও ইতিহাস রক্ষার নামে তারা আজও মিথ্যাচার করে যাচ্ছে—যেখানে বাস্তবতার বিপরীতে তারা নিজদের ‘অত্যাচারিত’ প্রমাণ করতে চায়। অথচ হকের দাবিতে আন্দোলনকারী এক জনপ্রিয় চেয়ারম্যানকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, শুধুমাত্র তিনি বাঙালির পক্ষে কথা বলেছিলেন বলেই। আজ ৩৭ বছর পার হলেও এই নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার এখনো তার পরিবার পায়নি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আব্দুর রশিদ সরকারের দুই স্ত্রী ও চার সন্তান এখনো তার হত্যার সুবিচার পাননি। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা এখনো ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছেন। তাদের দাবি, কেবল পারিবারিক ক্ষতিপূরণ নয়, জাতির পক্ষ থেকেও এই হত্যার যথাযথ স্বীকৃতি এবং বিচার হওয়া প্রয়োজন।
পরিবার ও স্থানীয়রা সরকারের কাছে, লংগদুতে আব্দুর রশিদ সরকার হত্যাকাণ্ডসহ সকল বাঙালি নিধনের তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণ দেয়া, পার্বত্য চুক্তির বিতর্কিত ধারাগুলো পর্যালোচনা করে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান অনুযায়ী সংশোধন করাসহ পার্বত্য অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদারে সেনা ক্যাম্প বৃদ্ধি করার দাবি জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও রাঙামাটি জেলা পরিষদের সদস্য হাবিব আজম বলেন, আব্দুর রশিদ সরকারের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। ইতিহাসকে বিকৃতির আগুনে পোড়ানো যাবে না। তাঁর ত্যাগ আমাদের কাছে কেবল স্মৃতি নয়—চেতনার দীপ্ত মশাল। পার্বত্য চট্টগ্রামে সহাবস্থান ও শান্তির ভিত্তি গড়ে তুলতে হলে, সন্ত্রাসের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে—আর সেটি শুরু হবে ন্যায়ের দাবির বাস্তবায়ন থেকেই।
তিনি আরও বলেন, শান্তিবাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল পার্বত্য এলাকায় বাঙ্গালী নেতৃত্ব শূন্য করা। যাতে বাঙ্গালীরা পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। শান্তিবাহিনী পাহাড়ের আনাচে কানাছে প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার করে চলতে পারে এটাই ছিল হত্যাকান্ডের মুল কারন।
উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের অতীত সংঘাতময় ইতিহাসের বহু ঘটনা এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যা শান্তি ও সহাবস্থানের পথে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।