মিয়ানমারের ভেতরে ঢুকে চীনের সীমান্ত বেড়া নির্মানের অভিযোগ, নীরব স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের উত্তর শান রাজ্যে চীন তাদের সীমান্ত ধীরে ধীরে মিয়ানমারের ভেতরে ঠেলে দিচ্ছে—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা বলছেন, এই ভূমি দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মতো অবস্থায় তারা নেই, কারণ স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও বেইজিংয়ের এই আগ্রাসনে সহযোগিতা করছে।
স্থানীয়দের মতে, গত মাস থেকে চীন সীমান্তে নির্মিত বেড়া কয়েক মিটার পর্যন্ত মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই কাজ হচ্ছে Myanmar National Democratic Alliance Army (এমএনডিএএ) এবং United Wa State Army (ইউডব্লিউএসএ)-নিয়ন্ত্রিত এলাকায়। চিনশ্বেহাও অঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, এমএনডিএএ—যা কোকাং গ্রুপ নামেও পরিচিত—চীনা নির্মাণ দলের সঙ্গে যৌথভাবে এই কাজ করছে।
একজন নারী বাসিন্দা বলেন, “কোকাং এলাকায় অনুপ্রবেশ সবচেয়ে বেশি। দুই পক্ষ একসঙ্গে বেড়া নির্মাণ করছে, তাই বোঝা যাচ্ছে তাদের মধ্যে কোনো চুক্তি আছে। সাধারণ মানুষ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভয়ে প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার শঙ্কায় কেউ মুখ খুলছে না।”
এমএনডিএএ ও ইউডব্লিউএসএ উভয়ই ১৯৮৯ সালে Communist Party of Burma-এর বিদ্রোহ থেকে উদ্ভূত। এমএনডিএএ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অধিকাংশ বাসিন্দাই চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে আগত জাতিগত চীনা বংশোদ্ভূত, আর ‘ওয়া’ জনগোষ্ঠী ভাষাগতভাবে মন-খেমার গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইউডব্লিউএসএ ১৯৮৯ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে করা যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখনো বজায় রেখেছে এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেয়, যা বর্তমান জান্তা সরকারের প্রধান সমর্থক। অন্যদিকে এমএনডিএএ ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করলেও ২০২৫ সালে চীনের চাপে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এরপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় চীনা ব্যবসা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দৈনন্দিন লেনদেনে চীনা ইউয়ানের ব্যবহারও বেড়েছে।
স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, নতুন সীমান্ত বেড়া এমএনডিএএ নিয়ন্ত্রিত চিনশ্বেহাও ও কিয়ুকোক-পানসাই এবং ইউডব্লিউএসএ এলাকার নামতিত অঞ্চলের কাছে নির্মিত হয়েছে। নামতিত এলাকায় পূর্বে যে ঝর্ণাটি সীমান্ত চিহ্নিত করত, সেটি এখন চীনের ভেতরে চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই অনুপ্রবেশ নিয়ে এখন পর্যন্ত এমএনডিএএ বা ইউডব্লিউএসএ কোনো প্রতিবাদ জানায়নি। ইউডব্লিউএসএর লিয়াজোঁ কর্মকর্তা নিয়ি রাং সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি শেয়ার করলেও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “উত্তর শানের জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো চীনের চাপের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো শক্তি রাখে না—এটা সবাই জানে।”
১৯৮৯ সালের সিপিবি বিদ্রোহের পর এমএনডিএএকে সালউইন নদীর পূর্বে একটি ছোট এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। তবে ২০২৩ সালের ‘অপারেশন ১০২৭’-এর পর তাদের পুনরুত্থান ঘটে এবং তারা কোকাং অঞ্চলের বাইরে বিস্তৃত হয়ে চীন-মিয়ানমার সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়।
অন্যদিকে ইউডব্লিউএসএ দীর্ঘদিন ধরে কার্যত স্বাধীনভাবে ‘ওয়া স্টেট’ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, যা তাদের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতির ফল।
আগে গ্রামবাসীরা সীমান্তে সমাবেশ বা সরকারের কাছে আবেদন করে অনুপ্রবেশের প্রতিবাদ করত। কিন্তু বর্তমানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য এবং জান্তা সরকারের নীরবতার কারণে এ ধরনের প্রতিরোধ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নতুন সরকার এবং তাদের রাজনৈতিক সহযোগী দল Union Solidarity and Development Party-ও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেয়নি, যা নিয়ে সমালোচকরা বলছেন—মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব চীনের স্বার্থে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে।
চীন ২০২০ সালের শেষ দিকে ‘সাউদার্ন গ্রেট ওয়াল’ প্রকল্পের আওতায় সীমান্তে ব্যাপক অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করে, যা করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে চালু করা হয়। ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণ করা হয়, যা ১৯৬০ সালের চীন-মিয়ানমার সীমান্ত চুক্তি এবং ১৯৬১ সালের প্রটোকলের লঙ্ঘন বলে অভিযোগ রয়েছে, যেখানে ১০ মিটার নিরপেক্ষ অঞ্চলে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।