শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে নতুন সামরিক শিক্ষা কর্মসূচি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়ে উইন ওও দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই মাসের মাথায় উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে নতুন কর্মসূচি চালু করেছে দেশটির সেনাবাহিনী।
গত মাসে তিনি ঘোষণা দেন, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সামরিক নিয়ন্ত্রিত ‘ইয়ুথ এডুকেশন ট্রেনিং স্কুল’ চালু করা হবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি অঞ্চলে এসব স্কুলে ভর্তির আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বর্তমান সামরিক পরিচালিত সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় নতুন এসব প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য সরাসরি বেসামরিক উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা। আবেদনকারীদের কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যার মধ্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। প্রতিরক্ষা পরিষেবা একাডেমি (DSA)-এর মতো নিয়মে আবেদন করতে হবে। সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, একটি স্কুল নেপিদোতে এবং আরেকটি ইয়াঙ্গুনের হ্লেগু টাউনশিপের ইয়েমন এলাকায় স্থাপন করা হবে। এতে ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে নিয়োগ দেওয়া হবে।
সাবেক মেজর সোয়ে তাউ, যিনি সেনাবাহিনী থেকে পলায়ন করেছেন, বলেন, এই উদ্যোগ মূলত নতুন জনবল তৈরির একটি কৌশল।
“এটা সেনাবাহিনীর জন্য জনবল তৈরির একটি উৎস গড়ে তোলার পরিকল্পনা। আগে থেকেই বেসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ডিএসএ, ডিফেন্স সার্ভিসেস টেকনোলজিক্যাল একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠান আছে। এখন তারা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করতে এই ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করছে,” বলেন তিনি।
শিক্ষা কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই সেনাবাহিনী সদস্যদের পরিবারের জন্য ১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। তবে নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সামরিক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
জেনারেল ইয়ে উইন ওও দাবি করেছেন, এই উদ্যোগ দেশের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত তরুণদের মধ্যে সামরিক মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা।

একসময় ডিএসএ-এর মতো সামরিক একাডেমিগুলো তরুণদের কাছে জনপ্রিয় ছিল, বিশেষ করে সাবেক স্বৈরশাসক থান শ্বে-এর আমলে। কিন্তু ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে সেনাবাহিনীর প্রতি জনরোষ বেড়েছে। আগে যেখানে গ্রামীণ পরিবারগুলো সন্তানদের সেনাবাহিনীতে পাঠাতে উৎসাহিত করত, এখন তারা তা প্রত্যাখ্যান করছে। ফলে জনবল সংকট মেটাতে সরকার বাধ্যতামূলক সেনাসেবা আইন কার্যকর করেছে।
সামরিক বাহিনী থেকে পলায়নকারীরা জানান, শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীরা এখন ১৮ বা ১৯ বছর বয়সে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে, যা অফিসার নিয়োগ কঠিন করে তুলেছে। নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সেই শিক্ষার্থীদের টার্গেট করা হচ্ছে।
শিক্ষাবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিকল্পনা কিশোরদের সামরিক মতাদর্শে দীক্ষিত করে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করার কৌশল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, “১৫ থেকে ১৭ বছর বয়স এমন একটি সময়, যখন তারা সহজেই প্রভাবিত হয়। ১৮ বছর পার হলে তা কঠিন হয়ে যায়। তাই সেনাবাহিনী তাদের ছোট বয়সেই টার্গেট করছে।”
থান শ্বে-এর আমলে সামরিক একাডেমিগুলোতে প্রতি বছর হাজারো ক্যাডেট ভর্তি হতো। বেসামরিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো চাকরির সুযোগ কম থাকায় এবং বিদেশে কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক তরুণ এসব প্রতিষ্ঠানে আগ্রহী ছিল, যেখানে থাকা-খাওয়া ও বেতন সুবিধা দেওয়া হতো।
এখনো “বীরত্বপূর্ণ সামরিক পেশা” প্রচারের মাধ্যমে কিছু নিয়োগ সম্ভব হলেও ডিফেন্স সার্ভিসেস টেকনোলজিক্যাল একাডেমি ও ডিফেন্স সার্ভিসেস মেডিকেল একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক শিক্ষার্থী বিকল্প সুযোগের অভাবে ভর্তি হয়। অভ্যুত্থানের পর অর্থনৈতিক সংকট, অস্থিরতা ও বেকারত্ব বাড়ায় এই প্রবণতা আরও জোরদার হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, দারিদ্র্যপীড়িত তরুণরা বাধ্য হয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারে।
সাবেক মেজর নাউং ইয়ো বলেন, “যেসব পরিবারের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই, তাদের কাছে এসব স্কুল জীবনরক্ষাকারী সুযোগ মনে হবে।”
সেনাবাহিনী এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া ও ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি স্নাতক শেষে সরাসরি অফিসার বা সিনিয়র নন-কমিশন্ড অফিসার প্রশিক্ষণে যাওয়ার সুযোগও থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, বাধ্যতামূলক সেনাসেবা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি দ্রুত জনবল বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা তরুণদের সামনে খুব কম বিকল্প রেখে দিচ্ছে।
অল বার্মা স্টুডেন্টস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের নেতা আয়ে লুইন বলেন, “আমরা আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হতে দেখছি। জোরপূর্বক নিয়োগ তাদের জীবন নষ্ট করছে, আর তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হলে দেশের ভবিষ্যৎও নষ্ট হবে।”
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।