উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার চিকেনস নেক নিয়ে নতুন কৌশল ভারতের
![]()
নিউজ ডেস্ক
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’কে ঘিরে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সীমান্ত নিরাপত্তা, সামরিক প্রস্তুতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন-তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে প্রাধান্য দিয়ে উত্তরবঙ্গকে একটি বিশেষ কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা সূত্রে এমনটাই জানা গেছে।
এ উদ্যোগ ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত এই সরু ভূখণ্ডটি ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। একদিকে বাংলাদেশ, অন্যদিকে নেপাল ও ভুটানের সীমান্ত ঘেরা এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের নিরাপত্তা নীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চীন সীমান্তের নিকটবর্তী তিব্বতের চুম্বি উপত্যকাকে কেন্দ্র করে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই এলাকার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে।
সম্প্রতি উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া, আসামের ধুবরি এবং বিহারের কিষানগঞ্জ এলাকায় নতুন সামরিক ঘাঁটি তৈরির খবর সামনে এসেছে। একই সঙ্গে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাসহ সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, এসব পদক্ষেপ শুধু সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যই নয়, বরং উত্তরবঙ্গকে অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনারই অংশ। শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে পাহাড় ও সমতল অঞ্চলকে যুক্ত করে একটি বৃহৎ কৌশলগত অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা চলছে।
এই পরিকল্পনার আওতায় সীমান্তবর্তী সড়কগুলোকে চার লেনে উন্নীত করা, বিকল্প পাহাড়ি রাস্তা তৈরি, বিমানবন্দর ও রেল অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য আরো বৃদ্ধি পাবে। শিলিগুড়ি তখন একটি বড় পণ্য পরিবহণ ও গুদামজাতকরণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
গোয়েন্দা মহলের একাংশের মতে, শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে চিকেনস নেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; বরং স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনও জরুরি। কারণ দীর্ঘদিন ধরে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় বঞ্চনা, অনুন্নয়ন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার অভিযোগ রয়েছে। সেই পরিস্থিতি বদলাতেই উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে একসঙ্গে সামনে আনছে কেন্দ্রীয় সরকার।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উত্তরবঙ্গে চিকিৎসা, শিক্ষা ও শিল্পখাতে বড় বিনিয়োগের প্রস্তুতিও চলছে। নতুন শিল্পনগরী, আধুনিক হাসপাতাল, প্রযুক্তি কেন্দ্র এবং পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার কথাও ভাবা হচ্ছে। এতে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কেন্দ্রের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ কিছুটা সহজ হয়েছে। আগে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে বহু প্রকল্প আটকে ছিল বলে দাবি করা হয়। বর্তমানে সেই বাধা অনেকটাই কমেছে।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, নিরাপত্তার নামে উত্তরবঙ্গকে অতিরিক্ত সামরিকীকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা স্থানীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবু কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান স্পষ্ট-নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে একসঙ্গে মিলিয়ে উত্তরবঙ্গকে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত করার প্রস্তুতি চলছে। ফলে আগামী দিনে ‘চিকেনস নেক’ শুধু একটি সংকীর্ণ সীমান্ত করিডর নয়, বরং ভারতের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।