পাহাড়ের বুকে সবুজ স্বপ্ন: খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় বাণিজ্যিক লটকন চাষে নতুন দিগন্ত
![]()
নিউজ ডেস্ক
পাহাড়ের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ পেরিয়ে, ঘন অরণ্যের কোলে গড়ে উঠেছে এক অনন্য ফলের বাগান। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে রসুলপুর এলাকায় ১৩ একর জমিজুড়ে স্বপ্নের এই বাগান গড়ে তুলেছেন কৃষক নুর আলম।
২০১৯ সালের গোড়ার দিকে যাত্রা শুরু হওয়া এই বাগানে এখন শোভা পাচ্ছে দেশি-বিদেশি নানা জাতের ফলগাছ ইংল্যান্ড থেকে আনা টিস্যু কালচার খেজুর, চাইনিজ কমলা, রামভুটান, লংগান, মিয়াজাকি আম, ভিয়েতনামি মাল্টা, মিশরীয় মাল্টা, আলুবোখারা, আপেল, নাশপাতি, অ্যাভোকাডোসহ আরও কত বিচিত্র সব গাছ।
তবে এই বাগানের সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি ফল লটকন। সম্প্রতি কৃষক নুর আলমের বাগান পরিদর্শনে গিয়ে চোখে পড়ে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। পাহাড়ের পাদদেশজুড়ে বিস্তৃত বাগানের সারি সারি গাছে থোকায় থোকায় ঝুলে আছে সোনালি-হলুদ রঙের পাকা লটকন। সবুজ পাতার আড়ালে উঁকি দেওয়া ফলগুলো যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক অপূর্ব শিল্পকর্ম। ফলের ভারে নুয়ে পড়া গাছগুলো জানান দিচ্ছে কৃষকের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, ধৈর্য ও স্বপ্নপূরণের গল্প। বাগানজুড়ে বিরাজ করছে এক সতেজ ও প্রাণবন্ত পরিবেশ, যা সহজেই আকৃষ্ট করছে দর্শনার্থীদের। একসময় অবহেলিত এই পাহাড়ি ফল আজ নুর আলমের বাগানে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে বাণিজ্যিক সফলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাঙালিদের কাছে ‘লটকন’ নামে পরিচিত এই ফলটি চাকমা ভাষায় ‘পচিমগুল’, মারমা ভাষায় ‘ক্যানাইজুসি’ এবং ত্রিপুরা ভাষায় ‘খুচমাই’ নামে পরিচিত যা পাহাড়ের বহু মানুষের কাছে এটি কতটা পরিচিত ও আপন, তারই প্রমাণ।
২০২২ সালের শুরুতে কৃষক নুর আলম নরসিংদী থেকে প্রতিটি ৩০০ টাকা দরে উন্নত জাতের ৬০টি লটকনের কলম সংগ্রহ করে বাগানে রোপণ করেন। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, যত্ন ও ধৈর্যের ফল মেলে গত বছর, যখন প্রথমবারের মতো গাছে ফল ধরে। সেই মৌসুমে প্রায় ২০০ কেজি লটকন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
চলতি মৌসুমে গাছগুলোর বৃদ্ধি ও ফলনের অবস্থা আরও ভালো হওয়ায় তিনি আশাবাদী এবার উৎপাদন আগের চেয়ে অনেক বেশি হবে। কৃষকের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এই বাগান এখন লটকন চাষে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
“বড় একটি গাছ থেকে ২২ থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। গত বছর প্রতি কেজি লটকন ১০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। খরচ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এ ফল চাষে লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি,” বলেন নুর আলম। চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় ৫০০ কেজি ফলন পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন।
শুধু নুর আলম নন, গোটা মাটিরাঙ্গা উপজেলাজুড়েই লটকন চাষে নতুন গতি এসেছে।

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাত্র ৯ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছিল, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩১ মেট্রিক টন। বছরের ব্যবধানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হেক্টরে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ মেট্রিক টন।
উপজেলার ব্যঙ্গমারা, সাপমারা, মোহাম্মদপুর, রসুলপুর ও আটবাড়িসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন লটকন গাছের বিস্তার ঘটছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি লটকন ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণত জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে ফল পাকতে শুরু করে এবং বাজারে সরবরাহ বাড়ে। তবে উঞ্চ আবহাওয়ার দরুন হয়তো
জুনের শুরু থেকেই বাজারে লটকন আসতে শুরু করেছে।
সাপমারার কৃষক জামাল হোসেন বলেন, “আগে লটকনকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এখন বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় অন্যান্য ফলের পাশাপাশি লটকন চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকরা আর্থিকভাবে আরও লাভবান হবেন।”
আরেক কৃষক শ্যামল ত্রিপুরা বলেন, “লটকন গাছের পরিচর্যা তুলনামূলকভাবে সহজ। পাহাড়ি পরিবেশে গাছ ভালো হয়, রোগবালাইও কম। তাই অনেক তরুণ কৃষক এখন এই চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।”

মাটিরাঙ্গা সরকারি ডিগ্রি কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক মো. আব্দুল হামিদ বলেন, “লটকন শুধু সুস্বাদু ফল নয়, পুষ্টিগুণেও এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ বাড়ানো গেলে পাহাড়ি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।”
পরিবেশকর্মী মাহফুজ রাসেল ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখছেন। তিনি বলেন, “পাহাড়ে ফলভিত্তিক কৃষি সম্প্রসারণ পরিবেশের জন্যও ইতিবাচক। লটকন চাষ বাড়লে পাহাড়ে সবুজায়ন যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষকদের আয়ও বাড়বে।”
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, “লটকন একটি উচ্চমূল্যের ও লাভজনক ফল। পাহাড়ি এলাকার মাটি ও আবহাওয়া এই ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
কম পুঁজি, কম পরিচর্যা আর অধিক মুনাফার সম্ভাবনা নিয়ে মাটিরাঙ্গার পাহাড়ি জমিতে দিন দিন বিস্তার লাভ করছে লটকন চাষ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই ছোট্ট হলুদ ফলটিই হয়ে উঠতে পারে পার্বত্য অঞ্চলের নতুন অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।