সেনাবাহিনীর মানবিক উদ্যোগে চোখের আলো ফিরে পেলেন পাহাড়ের ৮৪ অসহায় মানুষ
![]()
নিউজ ডেস্ক
দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে এক ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২০৩ পদাতিক ব্রিগেড ও খাগড়াছড়ি রিজিয়নের আওতাধীন মহালছড়ি জোন। বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও ছানি অপারেশন কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন করে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন পাহাড়ি এলাকার ৮৪ জন দরিদ্র ও অসহায় মানুষ।
দীর্ঘদিন ধরে ছানি ও বিভিন্ন চক্ষু সমস্যায় ভুগলেও আর্থিক সংকট, যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার অভাবে এসব মানুষের পক্ষে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তাদের সেই দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসে মহালছড়ি জোন।

জানা গেছে, গত ৭ মার্চ মহালছড়ি জোনের উদ্যোগে আয়োজিত বৃহৎ বিনামূল্যের চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পে প্রায় ১ হাজার ২৫ জন রোগীকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসকদের মাধ্যমে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ১২৭ জনকে ছানি অপারেশনের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। একইসঙ্গে প্রায় ১০০ জন রোগীকে বিনামূল্যে চশমা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হয়। পরবর্তীতে আরও ৬০ জনকে বিনামূল্যে চশমা বিতরণ করা হয়।
চিকিৎসা কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপে গত ৬ জুন মহালছড়ি জোনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ১০৬ সদস্যের একটি দল চট্টগ্রামের লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে যাত্রা করে। এ দলে ৮৪ জন ছানি রোগী এবং ২২ জন সহায়ক ছিলেন। রোগীদের মধ্যে ৪৫ জন নারী ও ৩৯ জন পুরুষ। এছাড়া ৪৪ জন বাঙালি এবং ৪০ জন বিভিন্ন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন।

মহালছড়ি জোনের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল জাবির আসিফ-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রোগীদের যাতায়াত, আবাসন, চিকিৎসা সমন্বয় এবং নিরাপত্তাসহ পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দিতে বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা করা হয়। যাত্রাপথে খাবার, চিকিৎসা সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধাও নিশ্চিত করা হয়।
চট্টগ্রামের লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে পৌঁছানোর পর রোগীদের বিস্তারিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং সম্পন্ন করা হয়। চিকিৎসকদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ৮৪ জনের মধ্যে ৭৬ জনকে তাৎক্ষণিকভাবে অপারেশনের জন্য উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়। বাকি রোগীদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় পরবর্তীতে অপারেশনের জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। পরদিন ৭ জুন নির্বাচিত রোগীদের সফলভাবে ছানি অপারেশন সম্পন্ন হয়।

অপারেশনের পর রোগীদের চিকিৎসা তদারকি, থাকা-খাওয়া এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহালছড়ি জোনের একটি সেনাদল নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে। দীর্ঘদিন ঝাপসা দৃষ্টিতে পৃথিবী দেখার পর নতুন করে স্পষ্টভাবে দেখতে পেরে অনেক রোগী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাদের মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি, আনন্দ এবং কৃতজ্ঞতার হাসি।
চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারী অনেকেই জানান, আর্থিক অক্ষমতার কারণে তাদের পক্ষে কখনোই এই ধরনের অপারেশন করানো সম্ভব ছিল না। সেনাবাহিনীর সহায়তায় তারা নতুন করে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ পেয়েছেন।

জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল জাবির আসিফ বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু দেশের নিরাপত্তা রক্ষাই নয়, জনগণের কল্যাণেও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী যেসব মানুষ চিকিৎসা সুবিধার অভাবে বছরের পর বছর কষ্ট ভোগ করছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এই উদ্যোগের মাধ্যমে অসহায় মানুষের জীবনে নতুন আলো ফিরিয়ে দিতে পেরে আমরা আনন্দিত।”
মহালছড়ি জোনের রেজিমেন্টাল মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ক্যাপ্টেন মো. বোরহান উদ্দিন বায়োজিদ বলেন, “ছানি একটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য সমস্যা। সময়মতো চিকিৎসা পেলে একজন মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। আমরা রোগীদের প্রাথমিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে অপারেশন এবং পরবর্তী চিকিৎসা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। ভবিষ্যতেও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”

চিকিৎসা কার্যক্রম শেষে সকল রোগী ও তাদের সহায়তাকারীদের নিরাপদে নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়। নতুন করে পৃথিবীকে দেখার আনন্দে উচ্ছ্বসিত রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
স্থানীয়রা মনে করেন, দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার বাস্তবতায় মহালছড়ি জোনের এ ধরনের উদ্যোগ শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, বরং মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও জনকল্যাণের অনন্য সমন্বয়ে পরিচালিত এই কর্মসূচি পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।