নির্বাচনের পর মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরও অবনতি হচ্ছে- জাতিসংঘ দূত

নির্বাচনের পর মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরও অবনতি হচ্ছে- জাতিসংঘ দূত

নির্বাচনের পর মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরও অবনতি হচ্ছে- জাতিসংঘ দূত
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী সাম্প্রতিক বিতর্কিত নির্বাচনের পর দেশটির পরিস্থিতি উন্নতি হয়েছে—এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ সতর্ক করেছেন যে বাস্তবে পরিস্থিতি আরও অবনতি হচ্ছে।

গত শুক্রবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, মিয়ানমার এখন গভীর রাজনৈতিক, মানবিক ও নিরাপত্তা সংকটে আটকে আছে।

তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাস্তব পরিস্থিতি দেখাচ্ছে যে মিয়ানমারের অবস্থার অবনতি অব্যাহত রয়েছে। ভুল কারণে এখানে নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “নেপিদো কর্তৃপক্ষের নির্বাচনের পর দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সময় নির্বিচার বিমান হামলা অব্যাহত ছিল এবং প্রয়োজনীয় সেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে।”

জুলি বিশপ জানান, তিনি এখন পর্যন্ত চারবার মিয়ানমার সফর করেছেন এবং তিনবার দেশটির সামরিক শাসক থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়া মিন অং হ্লাইং-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয় ২১ মে।

তিনি ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি), ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি), বিভিন্ন জাতিগত সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং সম্প্রতি নতুন গঠিত ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের স্টিয়ারিং কাউন্সিল (SCEF)-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘ “নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সমর্থন বা পর্যবেক্ষণ করেনি”, এবং মাঠপর্যায়ের অনেকেই জানিয়েছেন যে ভোটার উপস্থিতি ছিল কম, বিরোধী দলগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং সংঘাত চলাকালীন ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

রাজনৈতিক সংকটের বাইরে তিনি সতর্ক করেন যে মিয়ানমার এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে এবং এটি “বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধের কেন্দ্রস্থল” হিসেবে গড়ে উঠছে, যেখানে “আন্তর্জাতিক স্ক্যাম সিন্ডিকেটগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মানবপাচারের নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছে”।

মানবিক পরিস্থিতিকে তিনি ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, বর্তমানে ৩৭ লাখেরও বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত এবং আরও ১৬ লাখ মানুষ বিদেশে পালিয়ে গেছে। মিয়ানমার এখন বিশ্বের ছয়টি সবচেয়ে ভয়াবহ খাদ্য সংকটপ্রবণ দেশের একটি।

তিনি বলেন, ২০২৫ সাল ছিল “২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর শিশুদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর”, যেখানে প্রধান হত্যার কারণ ছিল বিমান হামলা।

তিনি আরও সতর্ক করেন যে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ এখন শুধু সামরিক বাহিনী নয়, সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও বাড়ছে, ফলে অনেক তরুণ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে এবং তারা পাচার, শোষণ ও অপরাধমূলক নেটওয়ার্কের ঝুঁকিতে পড়ছে।

রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “প্রায় ১০ বছর পরও রোহিঙ্গারা—যাদের অধিকাংশই রাষ্ট্রহীন—নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুতর বাধার মুখে রয়েছে।”

তিনি আটক নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নেত্রী অং সান সু চির অবিলম্বে মুক্তির আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “বছরের পর বছর কোনো স্বাধীন ও যাচাইযোগ্য তথ্য নেই তার পরিস্থিতি সম্পর্কে। আজ তার ৮১তম জন্মদিনে আমি তার মুক্তির আহ্বানে সবাইকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানাই।”

তিনি আরও বলেন, সু চি বন্দি থাকা অবস্থায় শান্তির অগ্রগতির কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই বলে অনেকেই মনে করেন।

জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের বারবার দেওয়া আহ্বান—সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা নিশ্চিতকরণ এবং রাজনৈতিক সংলাপ—মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষ “উপেক্ষা করেছে” বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

একই অধিবেশনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জুলি বিশপের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেয়। তারা বলে, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী “অকল্পনীয় ভোগান্তি সৃষ্টি করছে, যা গত বছরের তুলনায় আরও বেড়েছে”।

ইইউ আরও জানায়, সামরিক বাহিনীর নির্বাচনী প্রক্রিয়া ছিল “না মুক্ত, না সুষ্ঠু”—এবং এটি সহিংসতা, দমন-পীড়ন ও বর্জনের পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই এটিকে বৈধতা হিসেবে গণ্য করা যায় না।

ইইউ আট দফা দাবি উত্থাপন করে, যার মধ্যে রয়েছে মিয়ানমারের ওপর বৈশ্বিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা, সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বন্ধ, এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ)-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তারা বলে, ন্যায়বিচারই স্থায়ী শান্তি ও পুনর্মিলনের জন্য অপরিহার্য।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *