পাহাড়ে কায়েম করা হয়েছে এক সমান্তরাল সন্ত্রাসের রাজত্ব
![]()
নিউজ ডেস্ক
সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা শান্ত নদী আর মেঘের মিতালি যেখানে পর্যটকদের হাতছানি দেয়, সেই পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ এক অশান্ত আগ্নেয়গিরি। সম্প্রীতি আর সৌন্দর্যের আড়ালে সেখানে প্রতিনিয়ত ঝরছে রক্ত। স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর ক্রমবর্ধমান উগ্রতা, অবৈধ অস্ত্রের আস্ফালন এবং ক্ষমতার অন্ধ মহড়া সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলকে এক চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। পাহাড়ের দুর্গম ভাঁজে ভাঁজে এখন সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর বুলেটের শব্দ। হামলা, অপহরণ, খুন, গুম, চাঁদাবাজি এবং সুপরিকল্পিত ভয়ভীতির মাধ্যমে সেখানে কায়েম করা হয়েছে এক সমান্তরাল সন্ত্রাসের রাজত্ব। সাম্প্রতিক সময়ে (জুন ২০২৬ এর মাত্র একটি সাপ্তাহ) খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক সহিংস ঘটনাপ্রবাহ পাহাড়ের এই ক্ষতবিক্ষত ও বিপন্ন আইনশৃঙ্খলার নগ্ন রূপটিকেই আমাদের সামনে উন্মোচিত করে।
মাটিরাঙ্গায় ইউপিডিএফের বর্বরোচিত হামলা, বুলেটের আঘাতে বিদ্ধ বাঙালি শ্রমজীবী মানুষ
পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলায় আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসীত গ্রুপ)-এর সন্ত্রাসীদের আকস্মিক গুলিবর্ষণে এক নিরীহ বাঙালি শ্রমিকের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা পাহাড়ের সামগ্রিক জননিরাপত্তার কঙ্কালসার অবস্থাকে ফুটিয়ে তুলেছে। বিগত ২০ জুন ২০২৬, শনিবার রাত্রি আনুমানিক ৮ ঘটিকার সময় মাটিরাঙ্গা উপজেলার মুসলিম পাড়া গ্যাস পাম্প এলাকায় এই বর্বরোচিত ও কাপুরুষোচিত হামলার ঘটনাটি ঘটে। আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এই সশস্ত্র আগ্রাসনের শিকার হয়েছেন মো. জাহাঙ্গীর আলম (৩৮) নামের এক ভাগ্যবিদ্বেষী বাঁশ শ্রমিক। তিনি মাটিরাঙ্গা পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত আদর্শগ্রাম এলাকার বাসিন্দা বাচ্চু মিয়ার সন্তান। প্রত্যক্ষদর্শী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, ঘটনার দিন রাতে সাধারণ ছদ্মবেশে দুই সশস্ত্র ইউপিডিএফ সদস্য একটি মোটরসাইকেলে চড়ে মুসলিম পাড়া গ্যাস পাম্প এলাকায় আকস্মিক হানা দেয়। সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষ কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই সন্ত্রাসীরা তাদের সঙ্গে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র থেকে অতর্কিত কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণ শুরু করে। এ সময় সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশ বোঝাই গাড়ির সন্নিকটে কর্মরত শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলমের পায়ে তীব্র বেগে গুলি লাগে। গুলির আঘাতে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারা অসীম সাহসিকতায় তাকে উদ্ধার করে অনতিবিলম্বে মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তরিত করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
লামায় ভূমি বিরোধের আড়ালে জাতিগত দাঙ্গা বাঁধানোর অপচেষ্টা
বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলায় দীর্ঘদিনের একটি স্থানীয় ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি ও বাঙালি পক্ষের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী ও ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এই সহিংসতায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন, যার মধ্যে এক উপজাতি ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। গত ২১ জুন ২০২৬, রবিবার বেলা আনুমানিক ৩ ঘটিকার সময় লামা উপজেলার ১ নং গজালিয়া ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়া এলাকায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে।
স্থানীয় বিবরণী অনুযায়ী, উক্ত এলাকার একটি বিরোধপূর্ণ জমির মালিকানা ও ঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাঙালি বাসিন্দা মো. বজলুর রহমান (৮০) এবং ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিমন ত্রিপুরাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র অসন্তোষ ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চলছিল। বাঙালি পক্ষের দাবি, তারা সুনির্দিষ্ট ও বৈধ নথিপত্র মূলে দীর্ঘকাল ধরে এই জায়গাটি ভোগদখল করে আসছেন। অপরদিকে, উপজাতি পক্ষও উক্ত ভূমিকে তাদের পৈতৃক সম্পত্তি বলে দাবি করে আসছিল। সচেতন মহলের ধারণা, উভয় পক্ষের নিকট কাগজপত্র ঠিক থাকলেও দাগ নম্বর কিংবা সীমানাগত (চর্দ্দি) ত্রুটির কারণে এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। ইতিপূর্বে একাধিকবার সামাজিক সালিশী বৈঠকের মাধ্যমে এই বিরোধ নিষ্পত্তির প্রয়াস নেওয়া হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান অধরাই থেকে যায়। ২১ জুন বিকেলে উক্ত দখলীয় জমিতে বাঙালি পক্ষ যখন নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণ শুরু করে, তখন উপজাতি পক্ষ তাতে তীব্র বাধা প্রদান করে। একপর্যায়ে বাকবিতণ্ডা রূপ নেয় চরম সহিংসতায়। উভয় পক্ষের উত্তেজিত মানুষ লাঠিসোটা, দা, ধারালো ছুরি ও দেশীয় মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একে অপরের ওপর চড়াও হয়। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উভয় পক্ষের প্রায় ৬ থেকে ৭ জন মাথা, কাঁধ, পিঠ ও হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত এবং কোপের শিকার হন। আহতদের মধ্যে উপজাতি পক্ষের সূর্য মনি ত্রিপুরার পুত্র শিমন ত্রিপুরার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হলে তাকে সহ বাকিদের দ্রুত উদ্ধার করে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
বিকেলের এই সংঘাতের রেশ এখানেই থেমে থাকেনি। একই দিন সন্ধ্যা আনুমানিক ৬ ঘটিকার সময় উভয় পক্ষ পুনরায় উত্তেজিত হয়ে একে অপরের বসতবাড়িতে হামলা চালায় এবং অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে জনপদ পুড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করে। উপজাতি পক্ষকে জেএসএস সন্তু গ্রুপ উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে স্থানীয় শান্তিকামী জনসাধারণের সময়োচিত হস্তক্ষেপ ও দৃঢ় বাধার মুখে এক প্রলয়ঙ্কারী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও অগ্নিকাণ্ড এড়ানো সম্ভব হলেও সমগ্র এলাকায় চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার পর বাঙালি পক্ষ কোনো প্রকাশ্য কর্মসূচি পালন না করলেও, উপজাতিদের পক্ষ থেকে জেএসএস এর নির্দেশে বিতর্কিত “বিক্ষুব্ধ আদিবাসী ছাত্র জনতা” ব্যানারে ২৩ জুন সকাল ৯ ঘটিকায় বান্দরবান প্রেস ক্লাবের সম্মুখে এক বিশাল মানববন্ধন পালন করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, এই নিছক স্থানীয় ভূমি বিরোধকে পুঁজি করে পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস (সন্তু লারমা গ্রুপ) ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। স্থানীয় সুধী সমাজের আশঙ্কা, জেএসএস অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই সাধারণ আইনি ও সামাজিক বিরোধটিকে একটি ‘জাতিগত দাঙ্গা’ কিংবা পাহাড়ি-বাঙালি জাতিগত দ্বন্দ্বে রূপ দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
লামায় পর্যটক অপহরণ, মুক্তিপণের বিনিময়ে অবরুদ্ধ জীবনের অবসান
বান্দরবানের লামা উপজেলায় আইন অমান্য করে পর্যটকদের ওপর সশস্ত্র পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের এই থাবা পাহাড়ের পর্যটন শিল্পকে এক চরম হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। গত ২১ জুন ২০২৬, রবিবার বিকেল ৪ ঘটিকার সময় লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের আমতল এলাকার ‘লাল ব্রিজ’ নামক অত্যন্ত নির্জন স্থানে দুই বাঙালি পর্যটক অপহরণের শিকার হন। অপহৃত ব্যক্তিরা হলেন চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা ইউনিয়নের গৌড়স্থান গ্রামের মো. আনোয়ার এবং কাতার প্রবাসী মো. মহিউদ্দিন। জানা যায়, ওইদিন বিকেলে লোহাগাড়া থেকে তারা দুটি মোটরসাইকেল যোগে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকনের উদ্দেশ্যে লামার সরই এলাকায় ভ্রমণে আসেন। ভ্রমণ শেষে ফেরার পথে লাল ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে ওৎ পেতে থাকা কয়েকজন মুখোশধারী পাহাড়ি সন্ত্রাসী অস্ত্রের মুখে তাদের গতিরোধ করে। সন্ত্রাসীরা মোটরসাইকেল সহ দুই পর্যটককে জিম্মি করে দুর্গম পাহাড়ের অজ্ঞাত গহীনে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে অপহৃতদের জীবননাশের হুমকি দিয়ে পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়। চরম উৎকণ্ঠার পর, দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা যাবত অবরুদ্ধ থাকার পর গভীর রাতে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ পরিশোধ সাপেক্ষে সন্ত্রাসীরা তাদের মুক্ত করে দেয়।
এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় অধিবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ঘটনাস্থলের অত্যন্ত সন্নিকটে পুলিশ ফাঁড়ি ও নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। এই ধরনের নির্লিপ্ততা পাহাড়ে অপরাধীদের দুসাহস আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
কাপ্তাইয়ে ভিন্ন সমীকরণ, পিসিপি নেতার ওপর হিন্দু বাঙালি যুবকদের হামলা
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত জাতিগত সমীকরণে সাধারণত মুসলিম বাঙালিদের সঙ্গেই উপজাতিদের বিরোধের চিত্রটি বারবার গণমাধ্যমে উঠে আসে। তবে গত ২৩ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার সকাল ১১ ঘটিকার সময় রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলার বরইছড়িতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা পাহাড়ের জাতিগত ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ভিন্ন ও জটিল মনস্তাত্ত্বিক চিত্র উন্মোচন করেছে। বরইছড়ি বাজারে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) কাপ্তাই শাখার সভাপতি কেতন তঞ্চংগ্যার ওপর শুভ দাশ (২৫) নামের এক হিন্দু বাঙালি যুবকের নেতৃত্বে কয়েকজন অতর্কিত হামলা ও মারধর চালায়। আহত পিসিপি নেতা কেতন তঞ্চংগ্যা জানান, তিনি বিগত এক সপ্তাহ ধরে মারাত্মক অসুস্থ ছিলেন এবং ঘটনার দিন সকালে বরইছড়ি বাজারে ওষুধ ক্রয় করতে গিয়েছিলেন। এ সময় শুভ দাশ নামের ওই যুবক কথা বলার অজুহাতে তাকে ডেকে জোরপূর্বক সিএমবি অফিসের দিকে নিয়ে যায়। সিএমবি অফিসের অভ্যন্তরে যেতে অস্বীকৃতি জানালে সেখানে আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা ১০-১২ জন যুবক কাঠের বাটাম, কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে কাপ্তাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। কেতন এই পরিকল্পিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র এবং পাল্টা অভিযোগ থেকে জানা যায়, কর্ণফুলী কলেজের ২২/২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কেতন তঞ্চংগ্যার সঙ্গে শুভ দাশের পূর্ব থেকেই ব্যক্তিগত ও আদর্শিক বিরোধ ছিল। স্থানীয় কিছু মহলের দাবি, পিসিপি নেতা কেতন তঞ্চংগ্যার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, বাঙালি বিদ্বেষ ছড়ানো এবং সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জন সংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অনুঘটক হিসেবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে স্থানীয় হিন্দু বাঙালি সম্প্রদায়ের যুবকেরা দীর্ঘকাল ধরে ক্ষুব্ধ ছিল এবং সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই এই মারধরের ঘটনা ঘটেছে।
খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের দুই নেতা নিহত এবং একে-৪৭ উদ্ধার
পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় ও দীঘিনালা উপজেলায় পৃথক দুটি ঘটনায় পার্বত্য চুক্তি বিরোধী আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসীত গ্রুপ)-এর দুই শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। ২৪ জুন ২০২৬, বুধবার সংঘটিত এই দুটি ঘটনার একটিতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ সমরে এবং অপরটিতে প্রতিপক্ষ জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু গ্রুপ) সশস্ত্র অতর্কিত হামলায় দুই নেতার মৃত্যু ঘটে।
গত ২৪ জুন বুধবার সকাল ১০ ঘটিকার সময় খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার তৈকাথান এলাকার এক দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে সেনাবাহিনী ও ইউপিডিএফের একটি সশস্ত্র দলের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সিন্দুকছড়ি জোনের সেনাসদস্যরা ইউপিডিএফের একটি সক্রিয় ও সশস্ত্র ঘাঁটিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করলে সেখানে অবস্থানরত সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র থেকে অতর্কিত গুলিবর্ষণ শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে সেনাবাহিনী পাল্টা বুলেট ছুড়লে উভয় পক্ষের মধ্যে বেশ কিছু সময় ধরে প্রচণ্ড গোলাগুলি চলতে থাকে। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর রণকৌশল ও প্রচণ্ড চাপের মুখে টিকতে না পেরে ইউপিডিএফের সশস্ত্র স্কোয়াডটি তাদের ঘাঁটি ফেলে গহীন জঙ্গলে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে নিরাপত্তা বাহিনী উক্ত রণক্ষেত্র ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সক্রিয় সশস্ত্র সদস্য ববিন ত্রিপুরা (৩২)-এর মৃতদেহ উদ্ধার করে। নিহত ববিন রামগড় উপজেলার মাজারা টিলা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। এই অভিযান থেকে মংসানু মারমা ওরফে জীবন (২৯) নামে আরেক ইউপিডিএফ সদস্যকে গুলিবিদ্ধ ও আহত অবস্থায় আটক করতে সক্ষম হয় সেনাবাহিনী। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ঘটনাস্থল থেকে একটি অত্যাধুনিক একে-৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেল এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে, যা পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিপজ্জনক সামরিক প্রস্তুতির এক অকাট্য প্রমাণ। ইউপিডিএফ-এর খাগড়াছড়ি জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা পরবর্তীতে সংবাদ মাধ্যমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে তাদের এই ক্যাডারের নিহতের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
দীঘিনালায় জেএসএস-এর অতর্কিত হামলা, ইউপিডিএফ নেতা নিহত
একই দিন (২৪ জুন) দুপুর পৌনে ১ ঘটিকার সময় জেলার দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নে প্রতিপক্ষ জেএসএস (সন্তু লারমা) গ্রুপের সশস্ত্র হামলায় সুজন চাকমা (৪৮) নামে ইউপিডিএফ-এর এক কুখ্যাত ‘কালেক্টর’ বা চাঁদা আদায়কারী নিহত হয়েছেন। সুজন চাকমা উপজেলার কবাখালি ইউনিয়নের তারাবন্যা গ্রামের বিনন্দ মোহন চাকমার পুত্র। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সময় বাবুছড়া ইউনিয়নের মুড়োপাড়া চৌমুহনী সড়ক মোড়ের একটি দোকানে বসে সুজন চাকমা সাংগঠনিক বিষয়ে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলছিলেন। এমন সময় সাধারণ পোশাকে আসা জেএসএস সন্তু গ্রুপের ৫-৬ জন সশস্ত্র ঘাতক আচমকা তাকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে ব্রাশফায়ার করে। এতে ঘটনাস্থলেই সুজন চাকমার ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া দেহে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। হামলার পর পরই ঘাতকেরা পাহাড়ি পথ ধরে দ্রুত অন্তর্ধিত হয়। দীঘিনালা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুজন চাকমার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য প্রেরণ করে। এই হত্যাকাণ্ডের পর ইউপিডিএফ দীঘিনালা ইউনিট তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে সন্তু গ্রুপের সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
মাটিরাঙ্গায় সেনাবাহিনীর বিশেষ অপারেশন, বিপুল অস্ত্রসহ ৩ সন্ত্রাসী আটক
পার্বত্য চট্টগ্রামের অবৈধ অস্ত্রের অভয়ারণ্য ধ্বংস করার লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় এক সফল ও বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জামসহ ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ)-এর তিন সক্রিয় সন্ত্রাসীকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে। ২৫ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার ভোররাত আনুমানিক ৩টা ৩০ মিনিটের দিকে মাটিরাঙ্গা সদর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের দুর্গম রেখুং পাড়া এলাকায় এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানটি পরিচালিত হয়।
আটককৃত সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হলেন: ১. হ্লাপ্রুসাই মারমা (৩০), পিতা: থোয়াইগ্য মারমা (গুইমারা), ২. তেজেন্দ্র চাকমা (২৭), পিতা: সুমইল্লা চাকমা (গুইমারা), ৩. বিশ্ব ত্রিপুরা (২৮), পিতা: দুর্গ মোহন ত্রিপুরা (মাটিরাঙ্গা), সর্বজেলা খাগড়াছড়ি।
গুইমারা রিজিয়নের আওতাধীন মাটিরাঙা জোনের সেনাবাহিনী গোপন সূত্রে সংবাদ পায় যে, বাইল্যাছড়ি সংলগ্ন রেখুং পাড়ার একটি বিশেষ বাড়িতে ইউপিডিএফের একটি ভারী সশস্ত্র দল নাশকতার উদ্দেশ্যে অবস্থান করছে। তথ্যের সত্যতা যাচাই করে মাটিরাঙ্গা জোনের একটি চৌকস ও প্রশিক্ষিত দল গভীর রাতে উক্ত বাড়িটি চারদিক থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ঘেরাও করে। এরপর সুনির্দিষ্ট তল্লাশি চালিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় ওই তিন ইউপিডিএফ সদস্যকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে আটক করা হয়।
অভিযান শেষে আটককৃতদের হেফাজত থেকে যেসকল মারাত্মক অস্ত্র ও নথিপত্র উদ্ধার করা হয়েছে, তা নিচে বিবৃত হলো:
১টি সিলভার রঙের অত্যাধুনিক পিস্তল।
১টি কালো রঙের পিস্তল এবং ১টি দীর্ঘ ব্যারেলযুক্ত শটগান। পিস্তলের ম্যাগাজিনসহ পিস্তল ও শটগানের বেশ কয়েকটি তাজা কার্তুজ (গুলি) এবং ১টি ধারালো দেশীয় ছুরি। ১টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ওয়াকি-টকি সেট, ২টি স্মার্টফোন ও ৪টি বাটন ফোন। নগদ অর্থ, বিপুল পরিমাণ চাঁদার রশিদ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিবরণী সমৃদ্ধ কয়েকটি ছোট নোটবুক বা ডায়েরি এবং ব্যক্তিগত নথিপত্র।
গুইমারায় গোলাগুলি ও ছয় মামলার আসামি ঝিমিত চাকমা গ্রেফতার
খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপ ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের সাথে প্রসীত খীসা সমর্থিত ইউপিডিএফের এক ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। ২৬ জুন, শুক্রবার সকাল বেলা গুইমারা উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পাইনংপাড়া এলাকায় এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক ও চিরুনি অভিযানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ইউপিডিএফ-এর উপজেলা সংগঠক ঝিমিত চাকমা (৫০) গ্রেফতার হন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাইনংপাড়ার গহীন অরণ্যে দুটি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির টাকার ভাগাভাগি নিয়ে সকাল থেকেই ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়। গুলির শব্দে সমগ্র এলাকা কেপে উঠলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে অভিযান শুরু করে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে টিকতে না পেরে সশস্ত্র ব্যক্তিরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে যৌথ বাহিনী উক্ত এলাকা থেকে গুরুতর গুলিবিদ্ধ ও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ঝিমিত চাকমাকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং চিকিৎসার জন্য মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ করে। গুইমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহরাওয়ার্দী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, আটক ঝিমিত চাকমা ইউপিডিএফের প্রসীত গ্রুপের গুইমারা উপজেলার অন্যতম প্রধান সংগঠক। তার বিরুদ্ধে পার্বত্য অঞ্চলে হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও অপহরণসহ মোট ছয়টি গুরুতর ফৌজদারি মামলা ঝুলছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আত্মগোপনে থেকে পাহাড়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব পরিচালনা করছিলেন।
রাঙামাটিতে জেএসএস-এর নগ্ন থাবা, লাভ পয়েন্টে বাইকার অপহরণ
পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলগুলোর স্বৈরাচারী ও সন্ত্রাসী মনোভাব কতটা চরম আকার ধারণ করেছে, তার সর্বশেষ প্রমাণ মিলেছে রাঙামাটি জেলা শহরের আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়কে। গত শুক্রবার ২৬ জুন সন্ধ্যা সোয়া ৭ ঘটিকার সময় সড়কের লাভ পয়েন্ট অতিক্রম করে একটি রেস্টুরেন্টের সামনে রাউজান থেকে আসা এক সাধারণ মোটরসাইকেল আরোহীকে আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার পর তাকে পাহাড়ের গহীনে অপহরণ করে নিয়ে গেছে পার্বত্য চুক্তির পক্ষের দাবিদার সংগঠন জেএসএস (সন্তু লারমা গ্রুপ)।
নিরাপত্তাবাহিনীর একটি দায়িত্বশীল সূত্র এবং স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী ব্যবসায়ী এই লোমহর্ষক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। অপহৃত হওয়া ওই ভাগ্যহীন মোটরসাইকেল আরোহীর নাম আইয়ুব এবং তার পিতার নাম তৈয়ব উদ্দিন। তার বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় বলে জানা গেছে। ঘটনার সময় আইয়ুব মোটরসাইকেল চালিয়ে রাঙামাটি শহরের দিকে আসছিলেন। এ সময় ওৎ পেতে থাকা জেএসএস-এর সশস্ত্র ক্যাডারেরা মাঝরাস্তায় তার গতি রোধ করে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে তার সর্বস্ব লুটে নেয় এবং তাকে জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে পার্শ্ববর্তী গভীর ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকার অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়কের লাভ পয়েন্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন নির্জন অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ছিনতাই, অপহরণ ও চাঁদাবাজির নিরাপদ চারণভূমি হিসেবে পরিচিত হলেও সেখানে স্থায়ী কোনো নিরাপত্তা চৌকি গড়ে ওঠেনি।
কেএনএফের ধৃষ্টতা, স্বাধীন রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান অঞ্চলে নতুন আতঙ্ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) দেশের প্রচলিত আইন ও সার্বভৌমত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাধারণ জনগণের মৌলিক অধিকারের ওপর চরম আঘাত হেনেছে। গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে কেএনএফ তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক আইডি “KTC Today Media” থেকে একটি বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করে। কেএনএ মিডিয়া উইংয়ের পক্ষে তথাকথিত ‘ক্যাপ্টেন লরেন্স’ স্বাক্ষরিত ওই পোস্টে বলা হয়: “অত্রাঞ্চলের গ্রামবাসীদের জন্য কেএনএ-এর কর্তৃক বিশেষ সতর্কবার্তা: মুননুয়াম পাড়া ও আশেপাশে গ্রামবাসীদের জন্য বিশেষ অনুরোধ, আপনারা কেউই অযথা গহীন জঙ্গলে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো। এই সতর্কবার্তা অমান্য করে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে কেএনএ এই দায় নিবে না।”
একটি স্বাধীন, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে কোনো সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী কীভাবে সাধারণ নাগরিকদের নিজস্ব ভূখণ্ডে স্বাধীনভাবে চলাচলের ওপর এই ধরনের অসাংবিধানিক বিধিনিষেধ, হুমকি কিংবা তথাকথিত কারফিউ জারি করতে পারে, তা কোনো সচেতন নাগরিকের বোধগম্য নয়। এটি সরাসরি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং সংবিধানে বর্ণিত নাগরিকের স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকারের ওপর এক নগ্ন ও চরম চড়চাপড়।
স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিমত
সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্যাঞ্চলের বিভিন্ন দুর্গম জনপদে ইউপিডিএফ, জেএসএস এবং কেএনএফ-এর মধ্যকার এই ধারাবাহিক সংঘাত মূলত কোনো আদর্শিক লড়াই নয়; বরং এটি পাহাড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, প্রভাব প্রতিপত্তি অক্ষুণ্ণ রাখা এবং বার্ষিক কোটি কোটি টাকার অবৈধ চাঁদাবাজির অর্থ ও সাম্রাজ্যের ভাগ-বাটোয়ারাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক দলগুলোর এই অন্তর্ঘাতমূলক ও সশস্ত্র সংঘাত পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জাতিগত সহাবস্থান, শান্তি, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পথে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
এই শ্বাসরুদ্ধকর ও রক্তাক্ত পরিস্থিতি থেকে স্থায়ী উত্তরণের লক্ষ্যে পার্বত্য অঞ্চলের আপামর পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠী এখন একতাবদ্ধ হয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। পাহাড়কে অস্ত্রযুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে সচেতন মহলের পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের জোর দাবি জানানো হয়েছে:
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান: পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি কোনায়, বিশেষ করে দুর্গম সীমান্ত ও গহীন অরণ্যে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান জোরদার করতে হবে। একে-৪৭-এর মতো মারণাস্ত্রের উৎস ও চোরাচালানের রুট সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
সেনা ক্যাম্প বৃদ্ধি: ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর যেসব কৌশলগত ও দুর্গম এলাকা থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছিল, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে সেই সকল স্থানে অবিলম্বে নতুন সেনা ক্যাম্প স্থাপন ও সংখ্যা বৃদ্ধি করা জরুরি।
চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর আইন: পাহাড়ের প্রধান চালিকাশক্তি হলো অর্থনীতি ও পর্যটন। এই দুটি খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চাঁদা আদায়ের রসিদ বুক ও সিন্ডিকেট কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: খুন, গুম ও অপহরণের সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে প্রতিটি অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী রাজনৈতিক বা আঞ্চলিক সংগঠনের আড়ালে পার পেয়ে না যায়।
সবুজ পাহাড়ের শান্ত সমীরণে আর কোনো মায়ের বুক খালি হওয়া দেখতে চায় না এদেশের মানুষ। বিচ্ছিন্নতাবাদের কালো হাত ভেঙে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করাই হোক এই মুহূর্তের প্রধান অঙ্গীকার।
-ফেসবুক পোস্ট।