বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ৪ খলিফার নামে কোম্পানি, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া!

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ৪ খলিফার নামে কোম্পানি, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া!

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ৪ খলিফার নামে কোম্পানি, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া!
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

সামাজিক মাধ্যমে একটি খবর ছড়িয়েছে যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ‘দ্বিতীয় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’ নামে একটি নতুন ব্যাটালিয়ন গঠন করেছে। এই নতুন ব্যাটালিয়নের অধীনে মোট ৪টি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে যেগুলোর নামকরণ করা হয়েছে ইসলামের চার খলিফা হযরত আবু বক্কর (র), হযরত উমর (র), হযরত উসমান (র) এবং হযরত আলী (র) এর নামে।

এ বিষয়ে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে কোন খবর প্রকাশিত হয়নি। তবে ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে।

দ্য ডিসেন্ট নামের বাংলাদেশী একটি পোর্টাল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুটি সূত্র থেকে খবরটির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে। দুটি সূত্রই মিডিয়ার সাথে কথা বলার জন্য অনুমোদিত না হওয়ায় তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ফেসবুক পেইজে গত ১৮ জুন প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতেও নতুন ব্যাটালিয়ন উদ্বোধনের বিষয়ে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “সেনাবাহিনী প্রধান বিএমএ’তে ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’ এর শুভ উদ্বোধন করেন। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএমএ-তে প্রশিক্ষণরত অফিসার ক্যাডেটগণের পেশাগত দক্ষতা, নেতৃত্বের যোগ্যতা অর্জন এবং প্রশিক্ষণের সার্বিক মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ‘১ম বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’ এর পাশাপাশি ‘২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।”

সেনাবাহিনীর দুটি সূত্র থেকেই জানা গেছে যে, সম্প্রতি দ্বিতীয় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নটি গঠিত হয়েছে। এর আগে ‘প্রথম বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন’ নামে একটি ব্যাটালিয়ন ছিল যেখানে মোট ৬টি কোম্পানি রয়েছে। এর সাথে নতুন ব্যাটালিয়ন যুক্ত হলো, যেটিতে ৪টি কোম্পানি করা হয়েছে। এই চার কোম্পানির নামকরণ করা হয়েছে ইসলামের চার খলিফার নামে। প্রথম বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের ৬ কোম্পানির নাম বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বীরদের নামে।

সূত্রটি আরও জানিয়েছে, দ্বিতীয় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নে আরও দুটি কোম্পানির প্রস্তাব করা হয়েছে যেগুলো হবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পূর্ণাঙ্গ নারী কোম্পানি। তবে নবী মুহাম্মদ (স) এর কন্যা ফাতেমা (র) এবং স্ত্রী আয়েশা (র) এর নামে প্রস্তাবিত কোম্পানি দুটি এখনও অনুমোদিত হয়নি।

মূলত, সেনাবাহিনীতে প্রতিবছর রিক্রুট করা ক্যাডেটের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নতুন আরেকটি ব্যাটালিয়নের প্রয়োজন পড়ে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।

ভারতীয় কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া

নতুন ব্যাটালিয়নের কোম্পানিগুলোর ইসলামের চার খলিফার নামে নামকরণের বিষয়টি নিয়ে একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব খবরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এমন সিদ্ধান্তকে সশস্ত্র বাহিনীর ‘ইসলামীকরণ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদিও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে একাধিক ইউনিটের নাম হিন্দু দেবতাদের নামে রয়েছে।

নবভারত টাইমস নামে একটি সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম করা হয়েছে, “Bangladesh Army: Is General Zaman forming an Islamic army for Bangladesh? A company named after the Prophet’s first four caliphs.”

অন্যদিকে নর্থইস্ট নিউজ নামে একটি ওয়েবসাইটে শিরোনাম করা হয়েছে, “Bangladesh Army’s new battalion has Umar, Abu Bakr, Ali and Usman companies.”। প্রতিবেদনের ভেতরে মন্তব্য হিসেবে আরও লেখা হয়েছে, “Naming the four companies after close companions and fathers- and sons-in-law is a sign of growing Islamisation within the rank and file of the Bangladesh Army.”

অর্থাৎ, চার খলিফার নামে নামকরণকে সেনাবাহিনীর ‘ইসলামীকরণ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

যদিও যে কোন দেশের সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিষয়াদির নামকরণের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতিফলন নতুন কোনো বিষয় নয়। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীই তাদের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় চেতনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের ইউনিটের নামকরণ বা রণধ্বনি নির্ধারণ করে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানেও শতবর্ষ ধরে হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য, পৌরাণিক বীরগাথা এবং সংস্কৃত শ্লোকের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইউনিটের নাম হিন্দু দেবতা ও প্রতীকের নামে

ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কয়েকটি কোর, বিগ্রেড, ব্যাটালিয়ন রয়েছে যেগুলোর নাম সরাসরি হিন্দু দেবতার সঙ্গে যুক্ত প্রতীক থেকে নেওয়া হয়েছে।

একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি এলিট ব্যাটালিয়নের নামকরণ করা হয়েছে ‘ভৈরব ব্যাটালিয়ন’ নামে। ভৈরব হচ্ছে হিন্দু দেবতা শীবের অগ্নিমূর্তি।

এছাড়া কয়েকটি ইউনিটের নাম রয়েছে যেগুলো হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন প্রতীকের নামে।

যেমন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৭ কোরকে বলা হয় ব্রহ্মাস্ত্র কোর, ২১ কোরকে বলা হয় সুদর্শন চক্র কোর, ৩৩ কোরকে বলা হয় ত্রিশক্তি কোর, ১১ কোরকে বলা হয় বজ্র কোর, ১০ কোরকে চেতক কোর বলা হয়।

ব্রহ্মাস্ত্র হিন্দু পুরাণের অন্যতম শক্তিশালী দিব্যাস্ত্র। এটি মহাভারত ও রামায়নে বহুবার এর উল্লেখ রয়েছে।  হয়েছে। নামটির সঙ্গে সরাসরি ব্রহ্মা-প্রদত্ত অস্ত্রের সম্পর্ক রয়েছে এবং সামরিক শক্তির সর্বোচ্চ প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত এটি হয়েছে।

সুদর্শন চক্র হলো বিষ্ণু এবং তাঁর অবতার কৃষ্ণের ঐশ্বরিক অস্ত্র। হিন্দুধর্মে এটি ধর্মরক্ষা, ন্যায় ও অশুভ বিনাশের প্রতীক।

বজ্র মূলত বৈদিক দেবতা ইন্দ্রের অস্ত্র। ঋগ্বেদে ইন্দ্র বজ্র দিয়ে বৃত্রকে বধ করেন।

ত্রিশক্তি শব্দটি “তিন শক্তি” অর্থে ব্যবহৃত। শক্তি হিন্দুধর্মে দেবী বা মহাশক্তির অন্যতম মৌলিক ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা। যদিও “ত্রিশক্তি” কোনো নির্দিষ্ট দেবীর নাম নয় তবে দুর্গা, কালী, পার্বতী প্রমুখ দেবীদের সমষ্টিগত শক্তির ধারণার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

চেতক ছিলেন মহারানা প্রতাপের কিংবদন্তিতুল্য ঘোড়া। মহারানা প্রতাপকে ভারতে বহু হিন্দু জাতীয়তাবাদী বর্ণনায় মুঘল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে হিন্দু প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর রণধ্বনিতে হিন্দুধর্মের প্রভাব

ভারতীয় সেনাবাহিনীর রেজিমেন্টাল কাঠামো ব্রিটিশ আমল থেকেই এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যা মূলত ভারতের আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সাথে অবিচ্ছেদ্য। অধিকাংশ রেজিমেন্টের রণধ্বনি (War Cry) এবং আদর্শিক ভিত্তি সরাসরি হিন্দু দেব-দেবী বা প্রাচীন বীরদের নাম থেকে অনুপ্রাণিত।

যেমন, রাজপুত ও বিহার রেজিমেন্ট তাদের রণধ্বনিতে ভগবান হনুমান বা ‘বজরং বলী’-কে স্মরণ করে, যিনি হিন্দু পুরাণে অসীম শক্তি, আনুগত্য এবং অজেয় সাহসের প্রতীক। একইভাবে, কুমায়ুন রেজিমেন্ট রণক্ষেত্রে দেবী কালিকার নাম নেয়, যিনি অশুভ বিনাশকারী শক্তির মূর্ত প্রতীক, যা সৈনিকদের কঠিনতম মুহূর্তেও ভয়হীন লড়াই করার সাহস জোগায়।

আবার হিমালয় অঞ্চলের গাড়োয়াল রাইফেলস তাদের রণধ্বনিতে ভগবান বদ্রীনাথ বা ‘বদ্রি বিশাল’-এর আশীর্বাদ প্রার্থনা করে, যিনি স্থিতিশীলতা ও রক্ষাকর্তার প্রতীক। ডোগরা এবং নাগা রেজিমেন্ট যথাক্রমে দেবী জ্বালা এবং দেবী দুর্গার শরণ নেয়, যারা আদ্যাশক্তি ও অসুর বিনাশিনী হিসেবে পরিচিত।

মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি তাদের ঐতিহ্যের সাথে শিব ও ভবানী মাতাকে যুক্ত রেখেছে; ‘হর হর মহাদেব’ এবং ‘ভবানী মাতা কী জয়’ ধ্বনি তাদের বীরত্ব ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির পরিচায়ক। এছাড়া, ‘ব্রিগেড অফ দ্য গার্ডস’ তাদের রণধ্বনিতে বিষ্ণুর বাহন গরুড়কে স্মরণ করে, যা মূলত দ্রুততা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং শত্রুর ওপর ক্ষিপ্রগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার সংকেত দেয়।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *